Md. Abdullah Saeed Khan

বিবিধ…সম্পাদিত_সাঈদ

‘বিবিধ’ অংশটি আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের ‘সত্যের সন্ধান’ বইয়ের সর্বশেষ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে মাতুব্বর সাহেব প্রথম যে প্রশ্নটি করেছেন, সেটি নিয়ে লিখতে গেলে ভলিউমের পর ভলিউম বই লেখা যাবে, কিন্তু শেষ হবে না। অংশটির নাম- ‘বিবর্তনবাদ’। বলা হয়, আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধোঁকা এবং প্রতারণার নাম হল ‘বিবর্তনবাদ’। তিনি লিখেছেন- ‘আদম কী আদিমানব?’

আদম (আঃ) আদিমানব কীনা এই প্রশ্নের ব্যাখায় তিনি জীববিজ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করেছেন। জীবাশ্মবিদদের কথা উল্লেখ করেছেন। পৃথিবীর প্রথম প্রাণী কখন এলো, কীভাবে এলো ইত্যাদি আলোচনা নিয়ে হাজির হয়েছেন। উনি বলেছেন,- জীবতত্ত্ববিদদের মতে, জীবসৃষ্টির শুরুতে অতিক্ষুদ্র এককোষ বিশিষ্ট জীব ‘অ্যামিবা’ থেকে ক্রমবিবর্তন ও ক্রমবিবর্ধনের ফলে প্রথমে ব্যাক্টেরিয়া, সেখান থেকে স্পঞ্জ, মৎস, সরীসৃপ, পশু ইত্যাদি বহু জীবে রূপান্তরিত হয়ে শেষে ‘বন মানুষ’ তথা Anthorpoid ape এবং তাদের ক্রমোন্নতির ফলে বর্তমান সভ্য মানুষ এসেছে আজ থেকে প্রায় ত্রিশ হাজার বছর পূর্বে।

বিবর্তনবাদের আলোচনায় যাওয়ার আগে কিছু খুচরা আলাপ সেরে নেওয়া জরুরি মনে করছি।

বিবর্তনবাদীরা, বিশেষ করে বিবর্তনবাদকে যারা ‘সৃষ্টিতত্ত্বের’ বিপরীতে দাঁড় করাতে চায়, তারা ‘বিবর্তনবাদ’ শব্দটাকে এমনভাবে বলে, যেন এটা একেবারে গাছ থেকে আপেল পড়ার মতো সত্য কোন জিনিস।

‘বিবর্তন’ শব্দটা অন্য দশটি শব্দের মতো খুব সাধারণ একটি শব্দ। ধর্ম বলতে যেমন যেকোন ধর্মকে বুঝাতে পারে, প্রাণী বলতে যেমন যেকোন প্রাণীকে বুঝাতে পারে, মানুষ বলতে যেমন পৃথিবীর যেকোন ধর্মের, যেকোন গোত্রের, যেকোন বর্ণের মানুষকে বুঝাতে পারে, ঠিক তেমনি ‘বিবর্তন’ বলতেও সব ধরণের ‘বিবর্তন’কে বোঝাতে পারে। এখন যেকেউ প্রশ্ন করতে পারে,- বিবর্তন কতো প্রকারের হতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আপনাকে আগে ‘বিবর্তন’ শব্দের অর্থটা ভালোভাবে বুঝতে হবে। বিবর্তন বলতে আসলে কী বুঝায়?

বিবর্তন অর্থ পরিবর্তন বা ক্রমবিকাশ। অর্থাৎ, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তরণ হওয়াকেই মূলত বিবর্তন বলা হয়। এই ‘বিবর্তন’ শব্দটাকে বিভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা যায়। এর অর্থ নির্ভর করছে আপনি আসলে এই শব্দটাকে কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন এর উপর। যেমন,-  শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের ফলে মার্তৃগর্ভে একটি পূর্ণাঙ্গ মানব ভ্রুণের জন্ম,  ক্ষুদ্র একটি বীজ থেকে একটি মহীরূহ বৃক্ষের আবির্ভাব,  ইট, বালি, সিমেন্ট ইত্যাদির মিশেলের ফলে দৃষ্টিনন্দন দালানকোঠা ইত্যাদি তৈরিকে আপনি বিবর্তন বলতে পারেন। কারণ এখানে বিভিন্ন উপাদানের মিশেলের ফলে এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় উত্তরণ ঘটছে।  মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসমস্ত বিবর্তন একদম দিনের মতোই সত্য। এসবের ব্যাপারে কারো কোন প্রশ্ন নেই, আপত্তি নেই। কেউ কখনো এসবের পক্ষে প্রমাণও দেখতে চায় না।

অন্যদিকে, চার্লস ডারউইন প্রস্তাবিত বিবর্তনবাদ তত্ত্ব (Theory OF Evolution) হচ্ছে এমন একটি তত্ত্ব, যেখানে ‘বিবর্তন’ অর্থ হলো- বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে, একটিমাত্র অণুজীব থেকে এলোমেলো পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পুরো প্রাণীজগত এবং উদ্ভিদজগত বিবর্তিত হয়েছে।

একটিমাত্র এককোষী অণুজীব থেকে এলোমেলো পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে পুরো উদ্ভিদজগত এবং প্রাণীজগতের বিবর্তন এবং উপরে আলোচ্য বিবর্তন কখনোই এক নয়। উপরের আলোচ্য বিবর্তনের পক্ষে কোন প্রমাণাদির দরকার পড়েনা, অন্যদিকে ডারউইন প্রস্তাবিত বিবর্তনের পক্ষে কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে, বিবর্তনবাদের পক্ষে কোন প্রমাণ না থাকলে পৃথিবীর এতোগুলো বিজ্ঞানী তাহলে বিবর্তনবাদে বিশ্বাস করে কেনো? তারা কী বিজ্ঞান বুঝেন না? তারা কী ঘাস খান?

জ্বী। আবারো জোরালোভাবে দাবি করছি, বিবর্তনবাদের পক্ষে বিবর্তনবাদীরা কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ হাজির করতে পারেনা।  তারা আজ পর্যন্ত যে সমস্ত পরোক্ষ প্রমাণ আমাদের সামনে বা মিডিয়ার সামনে হাজির করেছে, তা-ও গোঁজামিল এবং কপটামিতে ভরপুর। মিসিং লিঙ্ক (Missing Link),  জাঙ্ক ডিএনএ (Junk DNA) সহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের ভন্ডামি বারবার আমাদের সামনে এসেছে। তবুও, বীরদর্পে বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানমহলে টিকে আছে।  কেনো টিকে আছে সেটা জানতে হলে আপনাকে এর পেছনের পলিটিক্সটা জানতে হবে। বস্তুবাদকে পৃথিবীতে সুপ্রতিষ্ঠিত করার একমাত্র মোক্ষম অস্ত্র এই ‘বিবর্তনবাদ’। ধর্মগুলো মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা, অনন্য হিসেবে দাবি করে থাকে। ধর্মের দাবি, পৃথিবীর সমস্তকিছু মানুষের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।  আর, এই পৃথিবীই মানুষের জন্য শেষ সময় নয়। পৃথিবীর পাঠ চুকিয়ে তাকে চলে যেতে হবে অনন্ত, অসীম এক সময়ের অধীনে। অন্য একটি জগতে। সেমেটিক ধর্মগুলোর মতে, এটি হলো পারলৌকিক জগত। সেই জগতে তার পাপ-পূণ্যের হিসাব দিতে হবে।

কিন্তু, বস্তুবাদ তথা ডারউইনবাদ যা ধারণা দেয়, তা থেকে বোঝা যায় যে, মানুষ আসলে বিশেষ কোন সৃষ্টি নয়। সে একটি ক্ষুদ্র এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হতে হতে আজকের আধুনিক মানুষ উন্নত পশু মাত্র। এই বস্তুবাদের আরো ধারণা হলো এই যে, পরকাল বলতে আসলে কিছু নেই। এই পৃথিবীই শেষ। এরপরে আর কোন জীবন বা সময় নেই।

এই বস্তুবাদকে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে হলে বিবর্তনবাদই হতে পারে এখানে মোক্ষম অস্ত্র। এজন্য বস্তুবাদের দখলে থাকা বিজ্ঞানীমহল এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন চক্র খুব সুকৌশলে পাঠ্যবইয়ে, ম্যাগাজিন, পত্রিকায় বিবর্তনবাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যেন এটা একেবারে গাছ থেকে আপেল পড়ার মতোই সত্য। উল্লেখ্য, বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন দেখিয়েছেন যে গাছ থেকে আপেল ভূমিতে পড়ছে পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্য। পুনঃ পুনঃ পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানিরা তার সত্যতা প্রত্যক্ষ করেছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ প্রত্যক্ষ করছে যে গাছ থেকে আপেল সব সময় ভূমিতেই পড়ছে উপরের দিকে উঠছে না। কিন্তু, এখন পর্যন্ত কোন বিজ্ঞানী দেখাতে পারেননি যে চোখের সামনে এক ধরনের শারীরিক গঠন বিশিষ্ট প্রাণী আরেক ধরনের গঠনে বিবর্তিত হয়েছে।

অথচ, যখনই কোন বিজ্ঞানী, গবেষক এই বিবর্তনবাদের সমালোচনা করেন, ঠিক তখনি সেই বিজ্ঞানী, গবেষক হয়ে পড়েন অন্ধবিশ্বাসী, ক্রিয়েশনিস্ট, গোঁড়া, মূর্খ ইত্যাদি। মোদ্দাকথা, বিবর্তনবাদের সমালোচনা করলে তাকে আর বিজ্ঞানী মহলে কোনরকম পাত্তা দেওয়া হয়না। তিনি যতো বড় বিজ্ঞানীই হোক, তাঁর যতো গবেষণা, কাজ থাকুক না কেনো, তাকে বিজ্ঞানমহলে তখন ‘আবর্জনা’ জ্ঞান করা হয়।

বিবর্তনবাদ বিরোধীদের সাথে বস্তুবাদী বিজ্ঞান মহল কীরকম আচরণ করে, সেটা নিয়ে একটা বিখ্যাত ডকুমেন্টারি করা হয়েছিলো একবার। ইউটিউবে ‘Expelled: No intelligence allowed’ লিখে সার্চ দিলেই সেই ডকুমেন্টারি দেখতে পাবেন।

পশ্চিমা দেশগুলোতে পদোন্নতি পেতে হলে, প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান পেতে হলে এবং বিজ্ঞান সাময়িকীতে লেখা ছাপাতে হলে বেশকিছু নিয়ম নীতিমালার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি নিয়ম হলো- চোখমুখ বন্ধ করে বিবর্তনবাদকে বিশ্বাস করে নেওয়া। এ প্রসঙ্গে, বিখ্যাত জীবাশ্মবিদ গুনটার বেকলির সাথে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রণিধানযোগ্য। তিনি জার্মানীর স্টাটগার্ডে অবস্থিত স্টেট মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রী-তে কিউরেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গুনটার বেকলি ছিলেন ফসিল ড্রাগনফ্লাই-এর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ । তিনি অনেকগুলো ফসিল ড্রাগনফ্লাই প্রজাতি আবিস্কার করেন এবং তার নামে একাধিক প্রজাতির নামকরণও করা হয়েছে। তিনি ছিলেন বিবর্তনবাদী এবং উক্ত মিউজিয়ামে বিবর্তনবাদ সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু, গত কয়েক বছর তিনি তার পড়ালেখার আলোকে বিবর্তনবাদের কথিত প্রমাণাদির উপর সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তে এসে পৌছান যে এলোপাতাড়ি বিবর্তনের প্রস্তাবিত কোন পদ্ধতিই প্রজাতির বিবর্তন প্রমানের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রথম প্রথম তিনি তার সিদ্ধান্তের বিষয়টি গোপন রাখলেও গতবছর তা প্রকাশ করেন। যার ফল- তাকে মিউজিয়ামের কিউরেটর পদ থেকে কোন উপযুক্ত কারণ প্রদর্শন না করেই অপসারণ করা হয়। উইকিপিডিয়ার মত তথাকথিত নিরপেক্ষ অনলাইন বিশ্বকোষ থেকে তার পেইজটিকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করা যেন জীবাশ্মবিদ্যায় তার কোন অবদানই নেই।(ref)
(রেফারেন্স: https://evolutionnews.org/2017/10/wikipedia-erases-paleontologist-gunter-bechly/)

একজন বিজ্ঞানী বিবর্তনবাদ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করলেও সেটা প্রকাশ করতে পারেন না তার সম্মান, মর্যাদা ইত্যাদি হারানোর ভয়ে। বলা চলে, অনেকটা জোর করে বিবর্তনবাদ বিশ্বাস করানো হয়।

আমেরিকান অণুজীব বিজ্ঞানী জোনাথন ওয়েলস ২০০০ সালে প্রকাশিত উনার বই ‘Icons OF Evolution’ এ লিখেছেন- “গোঁড়া ডারউইনবাদীরা প্রথমে ডারউইনবাদের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে ঘোষণা করে বসে যে বিজ্ঞান চর্চার এটাই একমাত্র রাস্তা। তখন সমালোচনাকারীরা হয়ে পড়ে অবৈজ্ঞানিক। সমালোচকদের নিবন্ধসমূহ গোঁড়াবাদী বিজ্ঞান সাময়ীকিগুলো প্রত্যাখ্যান করে। সরকারী সংস্থাগুলো সমালোচকদের অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানায়।সবশেষে, সমালোচককে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় থেকে বহিঃষ্কার করা হয়। এভাবেই, ডারউইনবাদী মতবাদের বিপক্ষে সকল প্রমাণ আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যায়, যেভাবে পুলিশ বাহিনীর বিপক্ষে সাক্ষী অদৃশ্য হয়ে যায়। অথবা, প্রমাণগুলোকে কবরস্থ করা হয় বিশেষায়িত প্রকাশনাগুলোতে, যার সন্ধান পান কেবল অতি কৌতুহলোদ্দীপক গবেষকরাই।

আর, যখনই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রমাণগুলো গায়েব করে দেওয়া যায়, ঠিক তখনই ডারউইনবাদীরা প্রচার করে বেড়ায় যে- বিবর্তনবাদের বিপক্ষে বৈজ্ঞানিক বিতর্ক আছে, কিন্তু কোন প্রমাণ মজুদ নেই…” (১) (Icons Of Evolution- 235-236)

এই হচ্ছে বিজ্ঞান মহলকে টুঁঠি চেপে ধরা বস্তুবাদীদের ভিতরের খবর। এভাবেই তারা চায় দুনিয়া থেকে ধর্ম উঠে যাক। স্রষ্টাতত্ত্বকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিতে পারলেই তারা তাদের ‘ভোগবাদী’ দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে। আর, এই কাজে তাদের একমাত্র তুরুপের তাস হলো- বিবর্তনবাদ।

সালটা ১৮৩২। ইংল্যান্ড থেকে ছেড়ে যায় H.M.S Beagle নামের একটি জাহাজ।  জাহাজে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর যাত্রী। কেউ সাগর ভ্রমণ করবে। মিতালী গড়ে তুলবে দুমড়ে পড়া প্রতিটা ঢেউয়ের সাথে।  কেউ উপভোগ করবে প্রকৃতির নিশ্চুপ নৈসর্গিকতা। জাহাজের পাটাতনে শুয়ে কেউবা সখ্যতা গড়ে তুলবে রাতের আকাশের সাথে। এরকম বিভিন্ন জনের বিভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যাত্রা করে এই জাহাজ। সেই জাহাজে একজন তরুণ লোক ছিলো। চেহারায় কাঠিন্যের কোন ভাব নেই। প্রকৃতি তার বেশ পছন্দের। প্রকৃতির টানে সেও ছুটে এসেছিলো সেদিন। লোকটার নাম চার্লস ডারউইন। শখের বিষয় প্রকৃতি হলেও ভদ্রলোককে পড়তে হচ্ছিলো প্রাণীবিজ্ঞান। অনেকটা, বাধ্য হয়েই পড়া যাকে বলে…

এভাবে, জাহাজে জাহাজে কেটে গেলো পাঁচ পাঁচটা বছর। বিভিন্ন দ্বীপ, অঞ্চলে গিয়ে জাহাজ নোঙর করতো, আর সবাই হুড়মুড় করে নেমে সেই দ্বীপ-অঞ্চলে বিচরণে ব্যস্ত হয়ে পড়তো। এভাবে, ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন প্রাণীদের বিভিন্ন গঠন, বিভিন্ন প্রজাতি দেখে অবাক হয় চার্লস ডারউইন। বিশেষ করে, গ্যালাপাগাস নামের এক দ্বীপে এক ধরণের ছোট ছোট পাখি দেখে খুবই আশ্চর্য হয়ে পড়েন। এই পাখিগুলোর ঠোঁটের ভিন্নতা দেখে তিনি মনে করলেন, পাখিগুলোর বাসস্থানের অভিযোজনের ফলে তাদের ঠোঁটে এরকম ভিন্নতা এসেছে। অর্থাৎ, প্রতিকূল পরিবেশের সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে নিতে সময়ের পরিক্রমায় এসব পাখিদের ঠোঁটে ভিন্নতা চলে এসেছে।

এই ধারণার উপর ভিত্তি করে তিনি মত দিলেন যে, প্রকৃতিতে প্রাণের ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর উৎপত্তি ঘটেছে এরকম অভিযোজনের ফলে। চার্লস ডারউইন এটাকে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ বলে উল্লেখ করেছেন।

চার্লস ডারউইনের মতে, প্রকৃতিতে একটি অবিরাম সংগ্রাম চলছে। সেটা হলো টিকে থাকার সংগ্রাম। এই টিকে থাকার সংগ্রামে যেসব প্রাণীরা নিজেদের প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তারা টিকে থাকে এবং যারা এই সংগ্রামে টিকতে ব্যর্থ হয়, তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এখন, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার এই সংগ্রামে অভিযোজনের ফলে তাদের মধ্যে নানা রকম বৈশিষ্ট্য যোগ-বিয়োগ হয়। এভাবে, একসময় একটা প্রাণী ভিন্ন একটা প্রজাতির প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়। সংক্ষেপে এটাই হলো ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো সহজে বোঝা যাবে। ধরুন, একটি জঙ্গলে দশটি হরিণ আছে এবং একটি বাঘ আছে। এখন ওই এলাকায় যদি নতুন করে আরো দু’টি বাঘের আগমন ঘটে, তাহলে হরিণগুলোর জন্য পরিবেশটা প্রতিকূল হয়ে উঠবে। এখন, এরকম প্রতিকূল পরিবেশে কেবল সেইসব হরিণগুলোই শেষপর্যন্ত টিকে থাকবে, যেগুলো বেশি দৌঁড়াতে পারবে। যেগুলো কম দৌঁড়াতে পারবে, সেগুলো বাঘের পেটে চলে যাবে।

ঘটনা সত্য। কিন্তু, ডারউইন বলেছেন, এই ঘটনা যদি চলমান থাকে, একটা সময়ে হরিণগুলো প্রতিকূল পরিবেশের সাথে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে ভিন্ন একটা প্রজাতিতে রূপান্তরিত হবে।

মজার ব্যাপার হলো, এরকম প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কোনভাবেই এক প্রজাতি থেকে ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর উদ্ভব সম্ভব নয়। এটা যে সম্ভব নয়, সেকথা হাল আমলের বিবর্তনবাদীরাই এখন অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে। অর্থাৎ, প্রাকৃতিক নির্বাচন কোনভাবেই নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করতে পারেনা। কিন্তু চার্লস ডারউইন মনে করতেন, প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলেই প্রকৃতিতে এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। তিনি নিজের বইয়ের নামকরণটাই করেছিলেন- ‘Origin Of Species by means of natural selection’

তবে, চার্লস ডারউইনই এই ধরণের তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা নয়। তার আগে এই ধরনের একটি প্রকল্প (Hypothesis)  দিয়েছিলেন ফ্রেঞ্চ জীববিজ্ঞানী লামার্ক । লামার্কের মতে, একটি প্রাণী তার অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে পৌঁছে দেয়। এভাবেই, আস্তে আস্তে একটা প্রাণী ভিন্ন একটা প্রাণীতে বিবর্তিত হয়। উদাহরণ হিসেবে তারা জিরাফের কথা বলে। তাদের মতে, হরিণ জাতীয় একপ্রকার প্রাণী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গলা উঁচিয়ে উঁচু থেকে উঁচুতর ডাল থেকে পাতা খেতে খেতে একসময় তাদের গলা লম্বা হয় এবং এভাবে তারা ভিন্ন একটা প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়। এভাবেই জিরাফের আবির্ভাব বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু, আধৃনিক জিনতত্ত্ববিদ্যার গবেষণার মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীতে এর পক্ষে কোন প্রমাণ না পাওয়ায় লামার্কিজম পরিত্যাক্ত হয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে এপিজেনেটিক্স-এর আবিস্কারের মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে যে একটি প্রজাতি তার কিছু অর্জিত বৈশিষ্ট পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিতে পারে। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে Eva Joblanka এবং Massimo Pigliucci-লামার্কিজম পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করছেন নিও-লামার্কিজম নামে। কিন্তু, গবেষণায় দেখা গেছে যে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি, হয় প্রজাতির গাঠনিক তথ্যের কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে না অথবা যে পরিবর্তন আনে তা পরবর্তী অল্প কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত পৌছে পুর্বাস্থায় ফিরে আসে।(ref) অর্থাৎ নিও-লামার্কিজমও প্রজাতিতে নতুন বৈশিষ্ট্যের আগমন ব্যাখ্যা করতে পারে না। 
(রেফারেন্স: Stephen Meyer, Darwin’s Doubt; 2013; HarperCollins Publishers, p. 331)

প্রাকৃতিক নির্বাচন যে কোনভাবেই নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করেনা, সেটা অকপটে স্বীকার করে British Museum of natural history এর একজন সিনিয়র জীবাশ্মবিদ, যিনি নিজেই একজন বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী, Colin Patterson বলেছিলেন- ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কেউ কখনো নতুন প্রজাতি উদ্ভব করতে পারেনি। কেউ কখনো এটার ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারেনি। নব্য ডারউইনবাদের বেশিরভাগ আলোচনাই এ সম্পর্কে…’

বিবর্তনবাদীরা তাদের বিবর্তনবাদের বইগুলোতে, ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’কে জায়েজ করতে একটি ঘটনা বর্ণনা করে থাকে। এই ঘটনা প্রথম বর্ণনা করেন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Douglas Futuyma ,১৯৮৬ সালে লেখা উনার ‘The Biology Of Evolution’ বইতে। এই ঘটনা Industrial Melanism নামে পরিচিত।

তিনি লিখেন,- ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিকে, ম্যানচেস্টারের আশপাশের গাছগুলোর বাকলের রঙ বেশ হালকা বা ফিকে ধরণের ছিলো। বাকলের রঙ ফিকে হওয়ার ফলে কালচে বর্ণের মথগুলো (এক ধরণের পোঁকা)  সহজে ধরা পড়তো এবং পাখিদের শিকারে পরিণত হতো। কিন্তু, পঞ্চাশ বছর পরে, দূষণের কারণে ভূইফোঁড় বা একজাতীয় ছত্রাক নিঃশেষ হয়ে গেলে ফিকে হওয়া গাছের বাকলের রঙ আস্তে আস্তে কালচে বর্ণ ধারণ করে। বাকলের রঙ কালচে হয়ে যাওয়ার ফলে কালচে রঙের মথগুলো আর সহজে ধরা পড়েনা। কিন্তু, এবার পাখিদের শিকারে পরিণত হতে শুরু করলো ফিকে বা হালকা রঙের মথগুলো। যেহেতু দূষণের কারণে গাছের বাকলের রঙ পরিবর্তন হয়ে কালচে হয়ে গেলো, সেহেতু ফিকে ধরণের মথগুলো সহজেই ধরা পড়তে লাগলো।

তো, বিবর্তনবাদীরা মনে করে, এই ঘটনা তাদের বিবর্তনবাদের পক্ষে বিশাল বড় একটি প্রমাণ। তারা খুব আনন্দের সাথে এই ঘটনা মানুষকে বলে বেড়ায়। কিন্তু, মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনা কোনভাবেই বিবর্তনবাদের পক্ষে প্রমাণ নয়। এই ঘটনা কী প্রমাণ করে যে মথগুলো বিবর্তিত হয়ে ভিন্ন কোন প্রজাতির উদ্ভব ঘটিয়েছে? না। বরং, কালচে এবং ফিকে রঙের মথ যেমন শিল্প বিপ্লবের পূর্বেও ছিলো, তেমনি শিল্প বিপ্লবের পরেও তাদের অস্তিত্ব ছিলো। দূষণের কারণে কেবল তাদের সংখ্যার পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র। এটা কোনভাবেই বিবর্তনবাদ বা প্রাকৃতিক নির্বাচনের পক্ষে প্রমাণ হতে পারেনা।

যদি মথগুলোর নতুন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গজাতো, তাদের জিনে নতুন তথ্য যোগ হতো, কেবল তখনই এটা বিবর্তনবাদের পক্ষে প্রমাণ বলে চালানো যেতো। কিন্তু বিবর্তনবাদীরা এই ঘটনাকে বিবর্তনবাদ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের পক্ষে জোরালো প্রমাণ হিসেবে চালায়। সাধারণ মানুষকে দিন-দুপুরে তারা ঘোল খাওয়ানোর চেষ্টা করে।

তাহলে, দেখা গেলো, ডারউইন প্রস্তাবিত পদ্ধতি ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ প্রজাতিতে নতুন ও সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আগমন ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ। অর্থাৎ ভুল প্রমাণিত হলো। প্রাকৃতিক নির্বাচন যে কোনভাবেই নতুন প্রজাতি উদ্ভব করতে পারেনা, সেটা প্রমাণিত হবার পরেই তো বিবর্তনবাদ তত্ত্বের তল্পি-তল্পা সহ জাদুঘরে চলে যাবার কথা। কিন্তু না। বিবর্তনবাদের প্রাথমিক প্রস্তাবনা ভুল প্রমাণিত হবার পরেও বিবর্তনবাদ বহাল তবিয়তেই বিজ্ঞানমহলে বর্তমান। কিন্তু কেনো? ওই যে, বস্তুবাদ। বস্তুবাদকে বাঁচাতে হলে বিবর্তনবাদের চেয়ে ভালো কোন ‘দাবার চাল’ আর কিছু নেই। সেজন্যে যেভাবেই হোক, এই বিবর্তনবাদকে বাঁচাতেই হবে। নাস্তিক জিনতত্ত্ববীদ Richard C. Lewontin-এর ভাষায়,

“বিজ্ঞান ও অতিপ্রাকৃতিক মাঝে আসল দ্বন্দ্বকে বোঝার চাবি হল কমনসেন্স বিরোধী বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মেনে নিতে আমাদের স্বদিচ্ছার দিকে তাকনো। যদিও বিজ্ঞানের কিছু মতবাদ সুস্পষ্টভাবে হাস্যকর, যদিও এটি জীবন ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের ব্যাপারে নান উচ্চভিলাষী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়, যদিও বৈজ্ঞানিক মহল অপ্রমাণযোগ্য কেবলই (শিশুতোষ) গল্প  (যেমন প্রাকৃতিক নির্বাচনের কিছ বিষয়) মেনে নিতে সহিষ্ণু- তবও আমরা বিজ্ঞানের পক্ষ নেই। কারণ আমরা আগে থেকেই বস্তুবাদের নিকট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ব্যাপারটা এমন নয় যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো বিস্ময়কর জগত সম্পর্কে একটি বস্তবাদী ব্যাখ্যা গ্রহনে কোন না কোনভাবে আমাদের বাধ্য করে। বরং, পক্ষান্তরে (বস্তুবাদের প্রতি) পূর্ব থেকেই আনুগত্যের কারণে আমরা বাদ্য হই (জগৎ অনুসন্ধানর) এমন উপকরণ ও কিছু ধারণা তৈরীতে যা বস্তুবাদী ব্যাখ্যাই জন্ম দেয়। সে ব্যাখ্যা যতই কাণ্ডজ্ঞানহীন হোক না কেন, অনভিজ্ঞদের জন্য যতই দুর্বোধ্য হোক না কেন। উপরন্তু, বস্তবাদই হল অকাট্য কারণ আমরা (আমাদের চিন্তার) দরজায় ঐশ্বরিক পদক্ষেপকে অনুমোদন করতে পারি না”। (ref)

(রাফান আহমেদ, বিশ্বাসের যৌক্তিকতা, পৃষ্ঠা- ৫১)

এ কারণে,বিবর্তনবাদকে বাঁচাতে পরে বিবর্তনবাদীরা আরো নতুন নতুন কিছু ফর্মুলা পেশ করেছে। এরকম কয়েকটি ফর্মুলাগুলো নিয়ে আমরা এখন আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।   

‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ পদ্ধতির অসারতা এবং বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব কল্যাণে DNA , RNA’র আবিষ্কার, মলিকুলার লেভেলে ব্যাপক অগ্রগতির ফলে ডারউইনের ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ পদ্ধতি যখন অসহায় হয়ে উঠে, তখন বিবর্তনবাদকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠে বিবর্তনবাদীরা। বিবর্তনবাদকে কীভাবে রক্ষা করা যায় এ ব্যাপারে তারা শলা পরামর্শের আয়োজন করে। ১৯৪১ সালে Geological Society Of America কর্তৃক আয়োজিত এক সভায় বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা একত্রিত হলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন Ernst Myar, Julian Huxley, George Gaylord Simpson, Glenn L. Jepsen, Ronald Fisher, Sewall Right সহ প্রমুখ। উদ্দেশ্য ছিলো, বিবর্তনবাদকে মেরামত করা।

তারা সবাই মিলে নতুন একটি পদ্ধতি দাঁড় করালেন। তারা প্রাকৃতিক নির্বাচনকে তো পাশে রাখলেনই, সাথে বললেন Random Mutation তথা এলোমেলো পরিবর্তনের ফলে একটি প্রাণীর জিনে নতুন নতুন তথ্য যোগ হয়। এসব নতুন নতুন তথ্যকে তারা নাম দিয়েছে ‘Advantageous Mutation’ বা ‘লাভজনক পরিবর্তন’। অর্থাৎ, প্রাণীর জিনে (Gene) মিউটেশনের ফলে নতুন নতুন তথ্য যোগ হওয়ার ফলে একসময় দেখা যায় যে, অই প্রাণীর মধ্যে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য চলে আসে। তখন সেই প্রাণীটা অন্য নতুন কোন প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়।

আরেকটু ক্লিয়ার করি। ধরুন, একটি পাখি। এই পাখির জিনে পাখিটার উড়ার, খাওয়ার, তাকানোর সবরকম জেনেটিক তথ্য আছে। পাখিটা সে মতেই উড়ে, খায়, দেখে। এখন, যদি পাখিটার জিনে মিউটেশন (পরিবর্তন) ঘটে, তাহলে সেই পাখিটার জিনোমে তথ্যের পরিবর্তন ঘটবে। দেখা যাবে, পাখিটার মধ্যে জলচর কোন প্রাণীর বৈশিষ্ট্য যোগ হয়ে গেছে। ফলে, পাখিটা তখন পাখি থেকে জলচর কোন প্রাণীতে পরিণত হবে। মোটামুটি, বিবর্তনবাদীদের প্রস্তাবিত Random Mutation বা এলোমেলো পরিবর্তনের এটাই সারমর্ম। এটাকে বলা হয় The Modern synthetic Evolution Theory । আর, এটার প্রবক্তাদের বলা হয় Neo-Darwinist ।

কিন্তু, তাদের প্রস্তাবিত সেই Random Mutation বা এলোমেলো পরিবর্তনের পক্ষে কোন প্রমাণ নেই। এ যাবতকালে গবেষণালব্ধ সকল তথ্য-উপাত্ত এটাই প্রমাণ করে যে, লাভজনক মিউটেশান বা Advantageous Mutation বলতে কিছু আসলে নেই। মিউটেশান কখনোই লাভজনক হয়না। প্রাণীর জিনে মিউটেশান ঘটলে তা কখনোই কোন উপকার করেনা, বরং ক্ষতি করে। মিউটেশনকে একটি দূর্ঘটনার সাথে তুলনা করা যায়। দূর্ঘটনা যেমন কখনোই নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেনা ধ্বংস ছাড়া, মিউটেশানও ক্ষতি ছাড়া নতুন কোনকিছুই সৃষ্টি করতে পারেনা। ভূমিকম্পের ফলে একটা বিল্ডিং যেভাবে ধ্বসে যায়, মিউটেশানও সেরকম ভাঙার কাজ করে প্রাণীর জিনে। আর এর প্রভাব পড়ে প্রাণীর শরীরে।

এলোমেলো পরিবর্তন কখনোই সুশৃঙ্খল কোনকিছু সৃষ্টি করতে পারেনা।  B.G Ranganathan এটাকে উল্লেখ করেছেন এভাবে,- “প্রথমত, খাঁটি মিউটেশন প্রকৃতিতে খুবই বিরল। দ্বিতীয়ত, প্রায় সমস্ত মিউটেশনই ক্ষতিকর, যেহেতু তা জিনের গঠনের সুনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনের এলোমেলো পরিবর্তন। অত্যন্ত সুসজ্জিত কোন সিস্টেমের মধ্যে এলোমেলো পরিবর্তন ভালো করার পরিবর্তে সবসময় খারাপটাই করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে তৈরি দালানে যদি ভূমিকম্প আঘাত করে, তাহলে দালানটির কাঠামোতে একটি এলোমেলো পরিবর্তন ঘটে যাবে, যাতে দালানটির উন্নয়ন সাধিত হবার কোন সম্ভাবনাই নেই…”  

এখন পর্যন্ত উপকারী মিউটেশনের কোন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। বরং, এ কথা বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, সব ধরণের মিউটেশনই ক্ষতিকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত পারমানবিক অস্ত্রের বিকিরণে ঘটিত সম্ভাব্য মিউটেশন সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে Committee On Genetic Effects of  Atomic Radiation একটি রিপোর্ট তৈরি করে। এই রিপোর্ট সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী  Warren Weaver বলেছেন, – “অনেকেই এই কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে যাবে যে, বাস্তবে আজ পর্যন্ত জানা মিউটেশনের শিকার সকল  জিনই ক্ষতিকর। অথচ, মিউটেশন হচ্ছে বিবর্তন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাহলে মিউটেশনের মাধ্যমে কীভাবে ভালো ফলাফল বা প্রাণী উন্নতর অবস্থা প্রাপ্ত হবে যখন সকল মিউটেশনই ক্ষতিকর?”

বিগত কয়েক দশক ধরে বিবর্তনবাদীরা ‘সফল মিউটেশন’ ঘটানোর জন্য প্রাণপনে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা বছরের পর বছর ধরে গবেষণাগারে মাছির উপর মিউটেশন চালিয়ে যাচ্ছে। মাছির উপর মিউটেশন চালানোর কারণ এটাই যে, মাছি খুব দ্রুত বংশ বিস্তার করতে পারে। প্রতি এগারো দিনে মাছি নতুন প্রজন্মের জন্ম দিতে পারে।  দীর্ঘ সময় ধরে বিবর্তনবাদীরা মাছির উপরে মিউটেশনের কাজ চালিয়ে মাছির একটি নতুন প্রজাতি তো দূরের কথা, একটা নতুন এনজাইমও এখন পর্যন্ত তৈরি করে দেখাতে পারেনি।

মাছির উপর গবেষণা করে মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন প্রজাতি সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়ে গবেষক Michel Pitman বলেছেন,- “মরগান, গোল্ডসচিমিডট, মুলারসহ আরো অনেক প্রজনন শাস্ত্রবিদ মাছির বিভিন্ন প্রজাতির উপরে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছেন। তারা মাছির বিভিন্ন প্রজাতিকে খুব গরম, ঠান্ডা, আলো-অন্ধকার, রাসায়নিক বিকিরণের মধ্যে রেখেছেন। সকল প্রকারের মিউটেশন সংগঠিত হয়েছে যার সবই বস্তুত ক্ষতিকারক। এটাকে কী মানবসৃষ্ট বিবর্তনের প্রমাণ বলা যাবে? একদম না। উৎপাদিত (মিউটেশনের ফলে বিকৃত) প্রাণীগুলোর অল্পই হয়তো বোতলের বাইরে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, মিউটেশনের ফলে উৎপাদিত প্রজন্ম মারা যায়, বংশবিস্তারে অক্ষম হয়ে পড়ে অথবা বংশানুক্রমে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়”

মাছির মধ্যে মিউটেশনের যে প্রভাব, মানুষের মধ্যেও ঠিক একইরকম প্রভাব দেখা গেছে। মানুষের মধ্যেও আজ পর্যন্ত উপকারি মিউটেশনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মানুষের মধ্যে ঘটা মিউটেশনের ফলাফল হিসেবে যা পাওয়া গেছে আজ পর্যন্ত তা হলো- বিকালাঙ্গতা, বৈকল্য বা জন্মগত মানসিক সমস্যা, ডাউন সিনড্রোম (একটি জিনগত রোগ), আলবিনিজম (ধবল জাতীয় রোগ বিশেষ), বামনত্ব অথবা ক্যানসার।

মিউটেশনের ফলে মানুষকে এরকম ভয়াবহ রোগগুলো পেয়ে বসে। কিন্তু এই মিউটেশনকেই বিবর্তনবাদীরা বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু এ কথা বলে নেওয়া জরুরি যে,- যা-ই ক্ষতিকর বা ক্ষতির কারণ, তা কখনোই বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ হতে পারেনা। কেননা, বিবর্তনের মূল সারমর্মই হলো বেঁচে থাকার উপযুক্ততা লাভ করা। অর্থাৎ, বেঁচে থাকার জন্য আগের অবস্থার চেয়ে ভালো অবস্থায় যাওয়া। কিন্তু, আমরা দেখতে পেলাম যে বাস্তবে ঘটনা ভিন্ন। মিউটেশন কখনোই উপকারী কোনকিছু ঘটাতে পারেনা। মিউটেশন যা ঘটায়, তার সবটাই ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং, বিবর্তনবাদীরা নতুন প্রজাতির উদ্ভবের জন্য যে মিউটেশনের কথা বলে, তাও ভুল প্রমাণিত হলো।

এরপর, বিবর্তনবাদীরা যখন বুঝতে পারলো যে কথিত ধীর এবং ক্রম বিবর্তন অসম্ভব, এবং ধীর প্রক্রিয়ার মিউটেশন কখনোই নতুন প্রজাতি উদ্ভাবনে সক্ষম নয়, তখন বিবর্তনবাদীরা তাদের বিবর্তনবাদকে আবারও ঢেলে সাজাবার প্রয়োজন অনুভব করলো। বিবর্তনবাদকে নতুনভাবে ব্যাখা করতে এবার এগিয়ে আসেন দুই প্রতিথযশা বিজ্ঞানী, আমেরিকান জীবাশ্মবিদ Niles Elredge এবং Stephen Jay Gould । তারা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, নব্য ডারউইনবাদীরা যে ধীর এবং ক্রম বিবর্তনের কথা বলে, সেটা আদতে অসম্ভব। তারা ফসিল রেকর্ড ঘেঁটে বুঝতে পারলেন, প্রকৃতিতে প্রাণীর আগমন ধীরগতিতে নয়, বরং আকস্মিকভাবে। অর্থাৎ, প্রাণীর জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির উদ্ভবের যে কল্পকাহিনী বিবর্তনবাদীরা আমাদের গিলানোর চেষ্টা করে, সেটা ভুল। তারা মনে করেন, প্রকৃতিতে প্রাণীর আগমন কোন ধীর প্রক্রিয়ায় নয়, বরং হঠাৎ করেই। এখন, যদি হঠাৎ করে প্রাণীর আগমন হয়, তাহলে এতোদিন ধরে বিবর্তনবাদীদের আনীত, প্রস্তাবিত সকল প্রস্তাবনাই বাতিল হয়ে যায়। প্রাণীর হঠাৎ আগমনের পেছনে তখন কেবল একটাই যুক্তিযুক্ত, বিজ্ঞানসম্মত উত্তর থাকতে পারে। সেটা হলো- কোন ডিজাইনারের উপস্থিতি। সেই ডিজাইনার নিঃসন্দেহে স্রষ্টা। কিন্তু, বস্তুবাদী বিজ্ঞান আর তার ধারক বাহকেরা যখন হলফ করেই ফেলেছে যে, কোনভাবেই তারা স্রষ্টাতত্ত্বকে বিজ্ঞানের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে দিবে না, তখন কীভাবে তারা প্রাণীর আকস্মিক আগমনের জন্য স্রষ্টাকে স্বীকার করে নিবে?

না। তারা যখন সেবারও ব্যর্থ হলো, তখন তারা নতুন আরো একটি প্রস্তাব নিয়ে হাজির হলো আমাদের সামনে।  বিজ্ঞানী Niles Eldredge এবং Stephen Jay Gould কর্তৃক প্রস্তাবিত সেই পদ্ধতির নাম- Punctuated Equilibrium । এই পদ্ধতি আগের Modern Synthetic Evolution Theory থেকে কিছুটা আলাদা। Modern Synthetic Evolution Theory মতে, প্রাণীর জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ পায়। যেমন- একটি মাছের জিনে কিছু মিউটেশনের ফলে সে আস্তে আস্তে উভচর বা স্থলচর প্রাণীর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লাভ করে। এভাবে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লাভ করার ফলে, একটা সময় পরে সেটা ভিন্ন একটা প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়।

কিন্তু, Punctuated Equilibrium এরচেয়ে একটু আলাদা। তারা প্রাণীর জিনে মিউটেশনের ফলে আস্তে আস্তে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আসার ব্যাপারটাকে স্বীকার করেনা। তাদের মতে,- প্রাণীর জিনে আকস্মিক বড় ধরণের মিউটেশনের ফলে হঠাৎ করেই খুব অল্প সময়ে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। অর্থাৎ, একটা সরীসৃপের জিনে আকস্মিক বড় ধরণের মিউটেশনের ফলে সরীসৃপের ডিম থেকে বেরিয়ে আসে প্রথম পাখিটি।  অর্থাৎ, একটি প্রজাতির জিনে অল্প কয়েক প্রজন্মে অসংখ্য ‘সুনির্দিষ্ট’ মিউটেশন এলোমেলো ভাবে হয়। ফলে, উক্ত প্রজাতি থেকে স্বল্প সময়ে অনেকগুলো ভিন্ন প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে। অত:পর উক্ত নতুন প্রজাতিগুলো অনেকদিন টিকে থাকে। 

তাদের দাবি অনুযায়ী, সরীসৃপ আস্তে আস্তে পাখিতে বিবর্তিত হয়নি, বরং সরীসৃপের ডিম থেকে কোনএকদিন হঠাৎ করে পৃথিবীর প্রথম পাখিটি বেরিয়ে আসে।

অর্থাৎ তাদের দাবি অনুযায়ী, সরীসৃপ থেকে পাখি এসেছে অসংখ্য র‍্যানডম মিউটেশন তথা এলোপাতারি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে- অল্প কয়েক প্রজন্মে। চিন্তা করে দেখুন, মাছি যেহেতু অল্প সময়ে বংশবৃদ্ধি করতে পারে, এই পদ্ধতি অনুযায়ী মাছির একটি প্রজাতিতে মিউটেশন ঘটাতে ঘটাতে অল্প কিছু প্রজন্মেই নতুন পোকার জন্ম নেয়ার কথা। অথচ, মাছির উপর বছরের বছরের এলোপাতারি মিউটেশন পরীক্ষা চালিয়েও উপকারী কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি, নতুন বৈশিষ্ট্যযুক্ত প্রজাতির আগমনতো অনেক পরের বিষয়।         

এ যেন ঠিক রূপকথার সেই গল্পের মতো যেখানে গল্পের ব্যাঙ একদিন হঠাৎ করে রাজকুমারে পরিণত হয়। আসলে, বিবর্তনবাদীদের প্রস্তাবিত গল্প আর রূপকথার গল্পের মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য নেই। কোন কোন জায়গায় তাদের গল্পগুলো রূপকথার গল্পগুলোকেও হার মানায়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, সময়ের বিবর্তনে বিবর্তনবাদীদের গল্পগুলোও বিবর্তিত হয়। তারা আজকে এক পদ্ধতির কথা বলে তো, আগামীকাল আরেক পদ্ধতি। তাদের নিজেদের মধ্যেই তাদের প্রস্তাবিত, আনীত পদ্ধতি নিয়ে ঐক্যমত্য নেই। তারা যখন দেখে যে আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার, মলিকুলার লেভেলের বিস্ময়কর সব উদ্ভাবন তাদের প্রস্তাবিত গল্পগুলোর বিরোধি হয়ে দাঁড়ায়, ঠিক তখনই তারা এক পদ্ধতি থেকে আরেক পদ্ধতিতে লাফ দেয়।

জীবাশ্ম রেকর্ডঃ বিবর্তনবাদীদের অসহায়ত্ব

জীবাশ্ম হলো, একটা প্রাণী যখন বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন তার গাঠনিক বিভিন্ন চিহ্ন প্রকৃতি সংরক্ষণ করে রাখে। জীবাশ্ম হলো, একটি বিলুপ্ত জীবের পূর্নাঙ্গ দেহ বা তার অংশবিশেষ, যা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত থেকে যায়।  এসব জীবাশ্ম থেকে কোটি কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া, বা অস্তিত্বে থাকা বিভিন্ন প্রাণী সম্পর্কে আমরা জানতে পারি।

এখন, বিবর্তনবাদীদের তত্ত্ব অনুসারে, প্রাণের বিবর্তন ঘটেছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। যেমন- একটা মাছের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আসতে আসতে সেটা একসময় ভিন্ন আরেকটা প্রজাতির প্রাণীতে বিবর্তিত হয়েছে। এখন, যদি তাই হয়, তাহলে প্রকৃতিতে এরকম অসংখ্য মিসিং লিঙ্ক মজুদ থাকার কথা যার অর্ধেক মাছ, অর্ধেক অন্য প্রজাতির। রূপকথার গল্পের মৎস কন্যার কথা মনে আছে? সেই মৎস কন্যাকে একটা উৎকৃষ্ট মিসিং লিঙ্ক হিসেবে কল্পনা করা যায়।

[উল্লেখ্য, কিছু কিছু বিবর্তনবাদীদের দাবি অনুসারে, মাছ থেকেই মানুষের বিবর্তন ঘটেছে।  যদি তাই হয়, তাহলে মৎস কন্যার মতো মিসিং লিঙ্ক থাকা আবশ্যক। যদি মাছ থেকেই মানুষ বিবর্তিত হয়, তাহলে তো আর এক লাফে মাছ মানুষে বিবর্তিত হয়ে যায়নি। বরং মাছে ধীরে ধীরে মানুষের মতো পা গজিয়েছে, হাত গজিয়েছে। এরপর মানুষের মতো চোখ, নাক, কান… এভাবেই সে একটা সময় পরে গিয়ে মানুষ হয়েছে। ঘটনা যদি এটাই হয়, তাহলে এই সময়ের কোন এক পর্যায়ে সেই মাছের মানুষের মতো মাথা আর মাছের মতো লেজ থাকা স্বাভাবিক। সে দৃষ্টিকোণ থেকে মৎস কন্যা কোন রূপকথার চরিত্র নয়, বরং বৈজ্ঞানিক চরিত্র বটে]

এখন, বিবর্তনবাদ তত্ত্বকে যদি প্রমাণ করতেই হয়, তাহলে প্রকৃতিতে মৎস কন্যার মতো এরকম অসংখ্য মিসিং লিঙ্ক মজুদ থাকার কথা। কিন্তু, বিবর্তনবাদীদের জন্য বড়ই আপসোস এবং পরিতাপের বিষয় এই যে, বিবর্তনবাদীদের দাবি প্রমাণ করে এমন মিসিং লিঙ্ক প্রকৃতিতে মজুদ নেই।

যদি তাদের দাবি অনুযায়ী, ধীর গতির বিবর্তন হয়েও থাকে, তাহলে প্রকৃতিতে হাজার বা কোটি কোটি নয়, মিলিয়ন মিলিয়ন মিসিং লিঙ্ক মজুদ থাকার কথা। পৃথিবীতে যতো প্রজাতির প্রাণী আছে, তারচেয়ে কয়েক কোটি গুণ বেশি হওয়ার কথা মিসিং লিঙ্কের সংখ্যা। কিন্তু আছে কী? নেই।

এই মিসিং লিঙ্ক যে বিবর্তনবাদের জন্য মরণ ফাঁদ হতে পারে, সেটা স্বয়ং চার্লস ডারউইনও জানতো। তাই তিনি তাঁর লেখা Origin Of Species: By means of natural selection বইয়ের ‘Difficulties Of the Theory’ অধ্যায়ে ব্যাপারটা অকপটে স্বীকার করে বলেছেন,- “আমার তত্ত্ব যদি সত্য হয়, তাহলে সমগোত্রীয় প্রজাতিগুলোর মাঝে সংযোগ রক্ষাকারী অসংখ্য মধ্যবর্তী প্রজাতির (Missing Link) অস্তিত্ব থাকার কথা। এদের অস্তিত্বের প্রমাণ শুধুমাত্র জীবাশ্মের মাধ্যমেই পাওয়া যেতে পারে…’

একই অধ্যায়ে তিনি আরো লিখেন,- “যদি এক প্রজাতি অন্য প্রজাতি থেকে সুন্দর ক্রমান্বয় অনুসরণ করে বেরিয়ে আসে, তবে কেন আমরা চারদিকে অসংখ্য মধ্যবর্তী প্রজাতির (Missing Link) দেখা পাইনা? কেন প্রজাতি সমূহের প্রকৃতি এলোমেলো হওয়ার পরিবর্তে সুগঠিত? তত্ত্বানুসারে যেহেতু অসংখ্য মধ্যবর্তী প্রজাতির অস্তিত্ব থাকার কথা, কেন পৃথিবীর স্তরে স্তরে সেসবের চিহ্ন অবশিষ্ট নেই? এই সমস্যাটি আমাকে খুব ভাবায়”

ডারউইন মনে করেছিলেন, তার সময়ে বিজ্ঞানের তেমন উন্নতি সাধিত না হওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবাশ্মের সন্ধান মিলেনি। তিনি আশাবাদী ছিলেন যে, একটা সময়ে জীবাশ্মগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মিসিং লিঙ্কের সন্ধান মিলবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, ডারউইনের মৃত্যুর দেড়শো বছর অতিক্রম করলেও আজ অবধি এমন কোন মিসিং লিঙ্কের সন্ধান বিবর্তনবাদীরা বের করতে পারেনি যা তাদের তত্ত্বকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে। জীবাশ্ম রেকর্ডে মিসিং লিঙ্কের এই ‘শূন্যতা’ দেখে হতাশ হয়ে বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Derek V. Ager বলেছেন,- “আমরা যদি জীবাশ্ম রেকর্ড খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করে দেখি তাহলে ঘুরেফিরে যে বিষয়টা সামনে আসে তা হলো- একদলের হঠাৎ বিলুপ্তি ও অন্যদলের বিস্ফোরণ কোন ধীর বিবর্তনের ফল নয়…’

আরেক বিবর্তনবাদী জীবাশ্মবিদ Mark Czarnecki আরো একধাপ এগিয়ে বলেছেন,- “বিবর্তনবাদ তত্ত্বটি প্রমাণের একটি বড় অসুবিধা হলো এই জীবাশ্ম রেকর্ড। পৃথিবীর পরতে পরতে সংরক্ষিত বিলুপ্ত প্রজাতি সমূহের ছাপ। এই জীবাশ্ম রেকর্ডে কখনোই ডারউইনের প্রস্তাবিত অন্তবর্তীকালীন রূপের দেখা মিলেনি। এর পরিবর্তে আমরা যা পেয়েছি তা হলো- প্রজাতি সমূহ একদম হঠাৎ করেই আগমন করেছে, আবার হঠাৎ করেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর এই জিনিসটাই সৃষ্টিতত্ত্ববাদীদের এই কথা বলতে ইন্ধন জুগিয়েছে যে,- প্রত্যেক প্রজাতিই স্রষ্টার সৃষ্টি…”

মিসিং লিঙ্কের এই ‘শূন্যতা’ বিবর্তনবাদীরাও জানে। কিন্তু, সাধারণ মানুষকে তো আর এসব জানানো যাবে না। জানালে তো থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। এজন্যই বিবর্তনবাদীরা প্রায়ই কল্পিত মিসিং লিঙ্ক তৈরি করে মানুষকে ধোঁকায় ফেলে। তারা বিভিন্ন মিসিং লিঙ্কের ছবি কম্পিউটারে ফটোশপ করে, এঁকে পাঠ্যবইয়ে এমনভাবে ছাপায় যেন এটা একেবারে গ্র্যাভিটির মতো সত্য কোন বিষয়। আদতে, বিবর্তনবাদীরা জালিয়াতি, প্রতারণা করে এসব মিসিং লিঙ্ক বানিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয়। তারা তাদের ইচ্ছা এবং কল্পনা মাফিক প্রাণীদের নাক, কান, চুল, ইত্যাদি অংকন করে পাঠ্যপুস্তকে ছাপায়। অথচ, এসবের কোনকিছুই জীবাশ্ম রেকর্ডে পাওয়া যায় না। তাহলে ওরা কীভাবে আঁকে? স্রেফ কল্পনা। সেভাবে তারা এক প্রাণীর হাঁড়, অন্য প্রানীর নাক, আরেকটা প্রাণীর চোয়াল এনে জোড়া তালি দিয়ে একটা কল্পিত ‘মিসিং লিঙ্ক’ তৈরি করে এবং বিবর্তনবাদী ও বস্তুবাদী মিডিয়া সেটাকে ফলাও করে প্রচার করে বেড়ায়।

এবার আমরা সেরকম কিছু ইতিহাস জানবো যেখানে বিবর্তনবাদীরা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েও ধরা খেয়েছে বারবার।

কিছু ধাপ্পাবাজির গল্পঃ

একফোঁটা উল্লুক এবং দুই ফোঁটা ওরাংওটাং মিলে হয় একটি পিল্টডাউন মানবঃ

১৯১২ সালে ইংল্যান্ডের পিল্টডাউন শহরে একটি জীবাশ্ম পাওয়া যায় বলে চারদিকে শোরগোল পড়ে। একটা খনির মধ্যে চোয়ালের কিছু হাঁড় এবং করোটির কিছু টুকরো পাওয়া যায়। চোয়ালের হাঁড়টা উল্লুকের মতো হলেও, করোটির টুকরোগুলো মানুষের খুলির মতো। প্রাপ্ত এই নমুনাগুলোর নাম দেওয়া হলো ‘Piltdown Man’ বা ‘পিল্টডাউন মানব’। এই পিল্টডাউন মানবের বয়স দেখানো হলো ৫,০০,০০০ বছর । রাতারাতি এই পিল্টডাউন মানবকে নিয়ে বিবর্তন পাড়ায় হৈচৈ শুরু হয়ে গেলো। এটাকে বলা হলো- মানুষ এবং এপে’র মধ্যকার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই পিল্টডাউন মানব নিয়ে বিজ্ঞান সাময়িকীতে লেখা হয় অসংখ্য প্রবন্ধ, অসংখ্য ব্যাখা-বিশ্লেষণ চলে আসে চারিদিক থেকে। এটাকে উল্লেখ করা হয়েছে বিবর্তনবাদের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে। এই জীবাশ্মের উপরে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভের জন্য ৫০০ টিরও বেশি থিসিস লেখা হয়েছিলো।

১৯২১ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়াম পরিদর্শন করতে গিয়ে নৃতত্ত্ববিদ Henry Fairfield Osborn বলেন,- ‘পিল্টডাউন মানব মানুষের প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার’

ন্যাশনাল জিওগ্রাফী চ্যানেল সহ নামকরা সব বিজ্ঞান সাময়িকী, ম্যাগাজিন, পিয়ার রিভিউ জার্নালে দিনরাত এই পিল্টডাউন মানবকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হতো।

কিন্তু, ১৯৪৯ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের জীবাশ্মবিজ্ঞান বিভাগেরর দায়িত্বরত জীবাশ্মবিদ, Kenneth Oakley ফ্লুরিন পরীক্ষা করলেন। উল্লেখ্য, ফ্লুরিন টেস্ট হলো জীবাশ্মের বয়স নির্ণয়ের নতুন পদ্ধতি। Kenneth Oakley যখন পিল্টডাউন মানবের উপর ফ্লুরিন টেস্ট করলেন, উক্ত টেস্ট শেষে তিনি যা ফলাফল পেলেন তা রীতিমতো চমকে যাবার মতো। উনি দেখতে পেলেন যে, পিল্টডাউন মানবের চোয়ালে কোন ফ্লুরিনই নেই। এতে বোঝা গেলো যে এটি মাত্র কয়েক বছর ধরে মাটির নিচে ছিলো। পিল্টডাউন মানবের খুলিতে খুব অল্প পরিমাণে ফ্লুরিন পাওয়া গেলো যা প্রমাণ করে যে এটা মাত্র কয়েক বছর আগেই সমাধিস্থ কোন খুলি।

প্রমাণ হলো যে, পিল্টডাউন মানবে চোয়াল এবং দাঁতের অংশটা মূলত ওরাংওটাং নামে আলাদা একটা প্রাণীর। এগুলোকে ঘষেমেঝে, পুরোনো বানিয়ে জোড়াতালি দিয়ে পিল্টডাউন মানব বলে চালানো হয়েছে।

এরপর, Joseph Weiner এর পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের পরে, ১৯৫৩ সালে পিল্টডাউন মানব নিয়ে জালিয়াতির ব্যাপারটা সকলের সামনে চলে এলো। প্রমাণ হলো যে, পিল্টডাউন মানবের মাথার খুলিটি পাঁচশো বছর আগে মারা যাওয়া একজন মানুষের এবং চোয়াল আর দাঁত সম্প্রতি মারা যাওয়া একটি উল্লুকের। সেগুলোকে ঘষেমেঁঝে, কৃত্রিম উপায়ে পুরনো একটা আমেজ তৈরি করে, জোড়াতালি দিয়ে বানানো হয়েছিলো এই পিল্টডাউন মানব। এভাবেই দীর্ঘ চল্লিশ বছর ভূয়া, নকল এবং জালিয়াতিপূর্ণ এই জিনিস বিজ্ঞানমহলে ‘বিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ’ হিসেব সংরক্ষিত ছিলো। জালিয়াতি ধরা পড়ার পর রাতারাতি সেটাকে ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।  

পিল্টডাউন মানব নিয়ে এরকম জালিয়াতি দেখে Sir Wilfred Le Gros Clark বলেন,- “কৃত্রিম ঘষামাঁজার চিহ্নগুলো খুব সহজেই নজরে আসলো। বাস্তবিক অর্থে, এই কৃত্রিম সংযোজনগুলো এতোটাই স্পষ্ট ছিলো যে, প্রশ্ন করা যেতে পারে,- এগুলো এতোদিন নজর এড়িয়ে ছিলো কীভাবে?”

পাঠক, এই হলো বিজ্ঞানমহলে সেসব বিজ্ঞানীদের ভেতরের গল্প যাদের আমরা চোখমুখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে ফেলি। একটা মতবাদকে দাঁড় করানোর জন্য তারা কী পরিমাণ যে অসততার আশ্রয় নিতে পারে, সেটা রীতিমতো অবাক করার মতো। এতো গেলো এক কাহিনী। এরকম আরো কাহিনী আছে যা শুনলে আপনার পিলে চমকে উঠবে।

নেব্রাসকা ম্যানঃ একটি শুকরের দাঁত থেকে একগুচ্ছ গল্পঃ

বিবর্তনবাদীরা তাদের কল্পিত বিবর্তনবাদকে প্রমাণ করার জন্য যেসব জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে, নেব্রাসকা মানবের ঘটনা তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য। ১৯২২ সালে American Musuem of Natural History এর পরিচালক Henry Fairfield Osborn দাবি করলেন যে, তিনি স্নেইক ব্রুক (Snake Brook) এর কাছাকাছি অঞ্চলে, পশ্চিম নেব্রাসকায় প্লাইওসিন যুগের মাড়ির একটি দাঁত পেয়েছেন। আরো দাবি করা হলো, এই দাঁতে নাকি মানুষ এবং উল্লুক উভয়ের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ব্যস, এই দাঁতটির নাম দেওয়া হলো- নেব্রাসকা মানব। কেউ কেউ দাবি করলো এটা আসলে পিথেক্যানথ্রোপাস ইরেক্টাস, আবার কেউ কেউ দাবি করলো এটা আসলে মানুষের নিকটবর্তী কোন প্রজাতির।  রাতারাতি এই ‘নেব্রাসকা মানব’ এর বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হলোHesperopithecus haroldcooki

এই একটিমাত্র দাঁতের উপর ভিত্তি করে বিবর্তনবাদীরা নেব্রাসকা মানবের পুরো একটি দেহ এঁকে ফেললো রাতারাতি। শুধু কী নেব্রাসকা মানবের দেহ? অই একটি দাঁতের উপর ভিত্তি করে তারা নেব্রাসকা মানবের স্ত্রী, সন্তান সহ পুরো পরিবারের চিত্র এবং এই নেব্রাসকা মানব যে পরিবেশে বেঁচে ছিলো, সেই পরিবেশের ছবি পর্যন্ত এরা এঁকে ফেললো। চিন্তা করে দেখুন এদের কল্পনাশক্তি কতো প্রখর। একটিমাত্র দাঁত থেকে তারা পুরো বংশ তালিকা বের করে ফেলেছে। সাধারণ বোধ সম্পন্ন যেকারো কাছে এটাকে রূপকথার গল্প বলে মনে হলেও, বিজ্ঞানের টিকাদারদের কাছে এটাই ‘বিশুদ্ধ’ বিজ্ঞান বলে পরিচিত।

সে যাইহোক, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা Osborn সাহেবের এই কল্পিত চিত্রকর্মকে খাঁটি বিজ্ঞান বলে স্বীকৃতি দিয়ে দিলেন। বিবর্তনবাদ মহলে তখন খুশির আমেজ। এতোদিন পর মিলেছে পরম আকাঙ্খিত বস্তুর সন্ধান। কিন্তু, William Bryan নামের একজন গবেষক বেঁকে বসলেন। একটিমাত্র দাঁতের উপর ভিত্তি করে পুরো বংশ তালিকা প্রণয়ন এবং বিবর্তনবাদীদের চিত্রকর্মে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। জোর দাবি জানালেন যে, এটা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। এটা নিয়ে আরো গবেষণা করা উচিত। কিন্তু কে শোনে কার কথা? বিবর্তনবাদীদের কী আর সে সময় আছে? তারা উল্টো William Bryan সাহেবকে নানাদিক থেকে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করতে লাগলো।

মজার ব্যাপার হলো, এর কিছু বছর পরে, অর্থাৎ ১৯২৭ সালে ওই দাঁতটি যে প্রাণীর ছিলো, গবেষকরা সেটার পুরো  কঙ্কালটাই খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়। কঙ্কালটা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখা গেলো, এটা না মানুষ ছিলো, না উল্লুক। বরং, এই দাঁতটি ছিলো আমেরিকার বিলুপ্ত হওয়া একপ্রকার শূকরের।

বিবর্তনবাদীরা একটি শূকরের দাঁতকে জালিয়াতি করে মানুষ এবং এর মধ্যবর্তী প্রজাতির বলে ঘোল খাইয়েছিলো।  পরে যখন প্রমাণ হয় যে এটা আসলে শূকরের দাঁত, তখন তারা তড়িঘড়ি করে তাদের বিবর্তনবাদের সব সাইট থেকে এই নেব্রাসকা মানবের ইতিহাস নামিয়ে ফেললো। বিজ্ঞানী William Gregory এই ঘটনার উপরে ‘Science’ ম্যাগাজিনে নিবন্ধ লিখেছিলেন ‘Hesperopithecus: Not an Ape not a Man’ শিরোনামে।

ওটা বেঙ্গাঃ খাঁচার ভেতর অচিন মানুষঃ

উহু, বিবর্তনবাদী জালিয়াতি কিন্তু এখানেই থেমে যায়নি। চার্লস ডারউইন মনে করতেন, একধরণের উল্লুকের মতো প্রাণী থেকেই আধুনিক মানুষের উৎপত্তি হয়েছে। তিনি তাঁর The Descent Of Man বইতে এমনটাই দাবি করেছিলেন। ডারউইনের এই কল্পনা নির্ভর চিন্তা অনেক বিবর্তনবাদীদের মনে দাগ কাটে। তারা ভাবলো, যেহেতু উল্লুক জাতীয় কোন প্রাণী থেকেই আধুনিক মানুষের উৎপত্তি, সেহেতু এখনো তাহলে পৃথিবীতে কিছু ‘অর্ধেক উল্লুক অর্ধেক মানুষ’ জাতীয় প্রাণীর সন্ধান মিলতে পারে। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা ‘উল্লুক মানুষ’ খোঁজার মিশনে নেমে পড়ে। ১৯০৪ সালে একজন বিবর্তনবাদী আফ্রিকার কঙ্গো থেকে ‘ওটা বেঙ্গা’ নামের একজন পিগমী (পিগমী হলো আফ্রিকা মহাদেশের অধিবাসীদের একটি দল। এরা খুব বেঁটে ধরণের হয়ে থাকে। এজন্য এদের সাধারণ মানুষদের চেয়ে খানিকটা ভিন্ন মনে হয়) সম্প্রদায়ের লোককে ধরে আনা হয়। দাবি করা হয় এই ওটা বেঙ্গা নাকি উল্লুক এবং মানুষের মধ্যবর্তী কোন প্রজাতি।  তাকে বিবর্তনবাদীরা শিকল দিয়ে বেঁধে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয়। St. Louis World Fair নামক মেলায় তাকে অন্যান্য উল্লুকের সাথে মানুষ এবং উল্লুকের মধ্যবর্তী রূপ হিসেবে প্রদর্শন করা হয়। দুই বছর পরে তাকে নিউইয়র্কের ব্রংক্স চিড়িয়াখানাতে প্রদর্শন করা হয় মানুষের প্রাচীন পূর্ব পুরুষ হিসেবে। চিড়িয়াখানায় ওটা বেঙ্গাকে রাখা হয় কিছু শিম্পাঞ্জী, ডাইনাহ নামের একটি গরিলা ও ডোহাং নামের একটি ওরাংওটাংয়ের সাথে।  তার সাথে এমন আচরণ করা হয় যেন সে একটি পশু। বেচারা এই অপমান সহ্য করতে না পেরে পরে আত্মহত্যা করে বসে। খবর পাওয়া যায়, তার এক স্ত্রী এবং দুই সন্তান ছিলো।

এভাবে, বিবর্তনবাদীদের জালিয়াতির সাক্ষী হতে গিয়ে প্রাণ হারায় ‘পিগমী’ সম্প্রদায়ের এই মানুষটিকে। অপরাধ হলো শারীরিকভাবে সে একটু বেঁটে।

জোড়াতালির জোয়ারঃ

১৯৭২ সালে কেনিয়ার রুডলফে কিছু টুকরো জীবাশ্ম পাওয়া যায়। এগুলোর নাম হয় Homo Rudolfensis । এই জীবাশ্ম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী রিচার্ড লেকী।  তিনি এই জীবাশ্মের খুলির নাম দেন ‘KNM-ER-1470’। রিচার্ড লেকীর মতে, এই জীবাশ্মের বয়স আটাশ লক্ষ বছর এবং এটি নৃতত্ত্ববিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। রিচার্ড লেকীর মন্তব্যকে অনেক নৃতত্ত্ববিদ সমর্থন করে বললেন যে এই হোমো রুডলোফিনসিসের সাথে হোমো হ্যাবিলিসের কোন পার্থক্য নেই।

রিচার্ড লেকীর দাবি ছিলো এই যে, এই হোমো রুডলোফিনসিসের করোটির আকৃতি অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মতো এবং এর মুখের আকৃতি আধুনিক মানুষের মতো। ব্যস! রিচার্ড লেকী সিদ্ধান্ত দিয়ে বসলেন যে- এই হোমো রুডলোফিনসিস মানুষ এবং অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মধ্যকার প্রজাতি।

কিন্তু, ১৯৯২ সালে কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানী Tim Bromage হোমো রুডলোফিনসিসের উপর গবেষণা করে প্রমাণ করেন যে, রিচার্ড লেকী হোমো রুডলোফিনসিসের যে খুলির নাম ‘KNM-ER-1470’ রেখেছিলেন, সেই খুলিটি আসলে জোড়াতালি দিয়ে লাগানো। খুলিটি মূলত একটি মানুষের। বিজ্ঞানী J.E Cronin, মিশিগান ইউনিভার্সিটির C. Loring Brace এবং জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির Alan Walker সহ প্রথম সারির সকল নৃতত্ত্ববিদরা একমত হলেন যে- এই ‘KNM-ER-1470’ আসলে মানুষ এবং অস্ট্রোলোফিথেইসাইনের মধ্যবর্তী কোন প্রজাতি নয়, বরং এটি অস্ট্রোলোফিথেসাইন গ্রুপেরই সদস্য।

এরপর, যেসব বিবর্তনবাদী সাময়িকী, মিডিয়া এই জীবাশ্মটিকে বিবর্তনবাদের প্রমাণ বলে পোস্টার টানিয়েছিলো, তারা সকলে রাতারাতি তাদের পোস্টার নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়।  

Ida- তাদের মোনালিসার উত্থান-পতনঃ

২০০৯ সাল। বিবর্তনবাদ মহলে ঈদের আমেজ। তাদের মতে, তারা তাদের বিবর্তনবাদকে সত্য প্রমাণ করার জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ারটি পেয়ে গেছে। কী নাম সেটার? সেটার নাম হলো- Ida । Ida নামের একটি ফসিলকে বিবর্তনবাদীরা তাদের তত্ত্বটির পক্ষে ইতিহাস বিখ্যাত প্রমাণ বলে চালাতে লাগলো। কেউ কেউ এটাকে বললো- ‘The eighth wonder of the world’। আবার কেউ কেউ এটাকে ‘Our Monalisa’ খেতাবও দিয়ে ফেলেছে ততোক্ষণে। তারা জোর গলায় বলতে লাগলো,- ‘আজ থেকে কেউ যদি দাবি করে যে বিবর্তনবাদের পক্ষে কোন প্রমাণ নেই, তাহলে তারা যেন Ida প্রমাণ স্বরূপ উপস্থিত করে’।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফী, হিস্ট্রী, ডিসকোভারি সহ সব বিবর্তনবাদী মিডিয়ায় দিনরাত ফলাও করে প্রচার করা হলো তথাকথিত মিসিং লিঙ্ক Ida’র খবর।

কিন্তু, মাত্র তিনবছর পরেই, ২০১০ সালে বিবর্তনবাদীদের কান্নার জলে ভাসিয়ে টেক্সাস ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো এবং ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা মিলে প্রমাণ করে দেখালেন যে Ida আসলে কোন মিসিং লিঙ্ক নয়। বরং এটি Lamour নামক একটি প্রাণীর ফসিল মাত্র।

ব্যস! সাথে সাথে বিবর্তনবাদ দুনিয়া থেকে Ida’র সবরকম চিহ্ন মুছে ফেলা হলো। এতোবড় জালিয়াতির পরেও তারা তাদের কল্পিত তত্ত্ব থেকে কোনভাবে বিশ্বাস হারালো না। এরকম জালিয়াতি, কপটতা, অসততার পরেও বীরদর্পে বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানীমহলে কেনো টিকে আছে পাঠক নিশ্চই এতোক্ষণে বুঝে ফেলেছেন।

মানুষের বংশ তালিকার ব্যবচ্ছেদঃ

এবার আমরা দেখে নিবো বিবর্তনবাদীদের দাবিকৃত বংশ তালিকার ঘাপলাটি। উল্লেখ্য, আরজ আলী মাতুব্বর সাহেব জীবাশ্মবিদ এবং জীববিজ্ঞানীদের দোহাই দিয়ে আধুনিক মানুষকে ত্রিশ হাজার বছর পূর্বের এবং মনুষ্য প্রজাতিটিকে লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বের বলে বিবর্তনের একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনাকে সত্য হিসেবে ধরে নিয়েছেন। যদিও তিনি বিস্তারিত কোন আলোচনা করেননি এ বিষয়ে।

বিবর্তনবাদীদের দাবি অনুসারে, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ বছর আগে, একপ্রকার উল্লুক জাতীয় প্রাণী থেকে আধুনিক মানুষের বিবর্তন শুরু হয়। সেই ক্রম অনুসারে, বিবর্তনবাদীরা মানুষের বংশ তালিকাটিকে মৌলিক চারভাগে ভাগ করে। সেগুলো হলো-

১। অস্ট্রোলোফিথেসাইন

২। হোমো হাবিলিস

৩। হোমো ইরেক্টাস

৪। হোমো স্যাপিয়েনস বা আজকের আধুনিক মানুষ।

অর্থাৎ, বিবর্তনবাদীদের দাবি অনুসারে, আজ থেকে চল্লিশ বা পঞ্চাশ হাজার বছর আগে, অস্ট্রোলোফিথেসাইন নামক একপ্রকার উল্লুক জাতীয় প্রাণী থেকেই মানুষের বিবর্তন শুরু হয়। সে অনুসারে, অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মাঝে হালকা কিছু মানুষের বৈশিষ্ট্য প্রথম দেখা যায়। অস্ট্রোলোফিথেসাইন থেকেই মানুষের বিবর্তন সূত্রপাত ধরে নিলেও, তারা অস্ট্রোলোফিথেসাইনকে হোমো (মানুষ) ক্যাটাগরিতে ফেললো না।  তাদের দাবি, অস্ট্রোলোফিথেসাইন উল্লুক শ্রেণীর হলেও এরা মানুষের মতো দুই পায়ে হাঁটতো যা সাধারণ উল্লুক পারেনা। তারা মনে করে, দুই পায়ে হাঁটতে পারাটাই অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মানুষে বিবর্তিত হবার প্রথম পদক্ষেপ। এজন্য, তারা তাদের বংশ তালিকার একেবারে সামনে রাখে এই অস্ট্রোলোফিথেসাইনকে। এরপর, সেই অস্ট্রোলোফিথেসাইন থেকে যেসব প্রজাতি বের হয়েছে, তাদের সবাইকে তারা ‘হোমো’ ক্যাটাগরিতে ফেললো। যেমন- হোমো হাবিলিস, হোমো ইরেক্টাস…

প্রথমে দেখে নেওয়া যাক অস্ট্রোলোফিথেসাইন কি আসলেই দুই পায়ে হাঁটতো কীনা।

অস্ট্রোলোফিথেসাইন যে দুই পায়ে হাঁটতো, এই দাবি প্রথম উত্থাপন করে Richard Leakey এবং Donald C. Johanson । কিন্তু, এরপরে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার দুইজন বিশ্ববিখ্যাত জীবদেহ বিশেষজ্ঞ Solly Zuckerman ও Prof. Charles Oxnard অস্ট্রোলোফিথেসাইনের বিভিন্ন প্রজাতির উপর ব্যাপক পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে প্রমাণ করেছেন যে, অস্ট্রোলোফিথেসাইন কখনোই মানুষের মতো সোজা হয়ে হাঁটতো না।

একজন বিবর্তনবাদী হয়েও, Solly Zuckerman এবং পাঁচ সদস্যের একটি গবেষক দল ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় পনেরো বছর ধরে অস্ট্রোলোফিথেসাইনের হাঁড়ের উপর দীর্ঘ গবেষনা পরিচালনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, অস্ট্রোলোফিথেসাইনরা কখনোই দুই পায়ে হাঁটতো না, এবং তাদের বৈশিষ্ট্যের আর সাধারণ উল্লুকদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোন ফারাক নেই।

এবং, এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী, Charles E. Oxnard অকপটে স্বীকার করেছেন যে- অস্ট্রোলোফিথেসাইনরা দুই পায়ে হাঁটতো না। বরং তাদের গঠন বর্তমানের ওরাংওটাং প্রাণীর মতোই।

তাহলে, বিবর্তনবাদীরা যে অস্ট্রোলোফিথেসাইনকে ‘দুই পায়ে হাঁটার বৈশিষ্ট্য’র জন্য মানুষের পূর্ব প্রজাতি বলে দাবি করে, সেই দাবিটা মিথ্যা, ভুল।

কিন্তু, আসল প্রশ্ন হলো, উল্লুক জাতীয় প্রাণী থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের আবির্ভাব প্রমাণের জন্য কতগুলো বিভিন্ন আকৃতির কঙ্কাল বা ক্রমান্বয়ে বড় আকৃতির করোটি দেখিয়ে দেয়াই কি যথেষ্ট? কেউ যদি একটি উল্লুক এবং একজন মানুষের ছবি সামনে রেখে কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে পার্থক্যের একটি বড় তালিকা তৈরী করে ফেলতে পারবে। যেমন- চার পায়ের পরিবর্তে দুটি পা, হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, হাতের আকৃতি, লেজের অনুপস্থিতি, গায়ের পশম, ত্বকের রঙ, মাথার আকার, কথা বলার যোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি অনেকগুলো পার্থক্যে মানুষ বিশেষায়িত। অন্যদিকে, আমরা জানি, একটি প্রজাতির সবগুলো অঙ্গ পারস্পরিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে কাজ করে। সে হিসেবে একটি প্রজাতিকে অন্য প্রজাতিতে পরিণত হতে হলে অনেকগুলো অঙ্গে একই সঙ্গে পরিবর্তন আসতে হবে। কোন একটি অঙ্গে পরিবর্তন হলে, অন্য একাধিক অঙ্গে আনুসঙ্গিক পরিবর্তন যদি না আসে তাহলে উক্ত প্রজাতিটি বেঁচে থাকার সংগ্রামে টিকে থাকতে পারবে না।

উদাহরণস্বরূপ, আমরা যদি একটি হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কথাই চিন্তা করি- একটি উল্লুক জাতীয় প্রাণীর বৃদ্ধাঙ্গুলিকে থেকে মানুষের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে পরিবর্তিত হতে হলে কবজির সাথে বৃদ্ধাঙ্গুলির সন্ধিতে (জয়েন্ট) পরিবর্তন আসতে হবে, হাড়ের উচ্চতায় পরিবর্তন আসতে হবে, বৃদ্ধাঙ্গুলীর সাথে সংশ্লিষ্ট মাংসপেশীর সংখ্যা ও সংযোগস্থলে পরিবর্তন আসতে হবে, সংশ্লিষ্ট স্নায়ু ও রক্তনালীতে পরিবর্তন আসতে হবে এবং মস্তিষ্কের যেই অংশ হাতের নিয়ন্ত্রণ করে সে অংশে পরিবর্তন আসতে হবে। অর্থাৎ, শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির জন্যই মানবশরীরের তিনটি পৃথক তন্ত্রে সুনির্দিষ্ট ও যুগ্ম পরিবর্তন আসতে হবে। সুতরাং, যখন উপরিল্লিখিত অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলোকে বিবেচনা আনা হবে, তখন উল্লুকজাতীয় প্রাণী থেকে মানুষের বিবর্তনের গল্পটি রূপকথাকেও ছাড়িয়ে যায়।

এছাড়াও, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মানুষের মত চিন্তাভাবনার ক্ষমতা সম্পন্ন মস্তিষ্কের কোন প্রয়োজন নেই। কারণ, বেঁচে থাকার সংগ্রামের জন্য দরকার অধিক প্রজনন ক্ষমতা। অথচ, মানুষের উন্নত মস্তিষ্ক এমন একটি অঙ্গ যা খাদ্য উপাদান থেকে সংগৃহিত শক্তির একটা বড় অংশ খেয়ে ফেলে। যার ফল হলো, প্রজনন ক্ষমতার ব্যবহার কমে যাওয়া। অর্থাৎ, বেঁচে থাকার সংগ্রামে উন্নত চিন্তাশক্তি সম্পন্ন মস্তিষ্ক কোন ‘সারভাইভাল বেনিফিট’ দেয় না। সুতরাং, বিবর্তনবাদ মানুষের উন্নত মস্তিষ্কের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না। এটা আমাদের কথা না। স্বয়ং বিবর্তনবাদীরাই এ কথা বলছেন। ডিএনএ-এর গঠন আবিস্কারকদের একজন, বিবর্তনবাদী নাস্তিক ফ্রান্সিস ক্রিক বলেন,

“সর্বোপরী আমাদের অত্যন্ত বিকশিত মস্তিষ্ক বৈজ্ঞানিক সত্য আবিষ্কারের জন্য বিবর্তিত হয় নি বরং কেবলেই বেঁচে থাকা ও বংশধর রেখ যাওয়ার জন্য আমাদের যথেষ্ট দক্ষ করে তুলতে বিবর্তিত হয়েছে”।(Ref)

উৎস: রাফান আহমেদ, বিশ্বাসের যৌক্তিকতা, পৃষ্ঠা নং – ৪১;

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top