
সত্যবাদীদের প্রমাণ (বুরহান আল-সিদ্দিকীন): ইবনে সিনার যুক্তি
ধরুন, আপনার এক বন্ধু আপনার কাছে পাঁচশো টাকা ধার চাইল। আপনি জিজ্ঞেস করলেন, টাকাটা তুমি কোথা থেকে দেবে? সে বলল, আমি আমার আরেক বন্ধুর কাছ থেকে ধার নিয়ে দেব। আপনি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আর সেই বন্ধু কোথা থেকে পাবে? উত্তর এলো, সে তো আরেকজনের কাছ থেকে ধার নেবে। এভাবে চলতেই থাকল। একজনের পর একজন, শুধু ধার করেই পরেরজনকে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছে। ধরুন এই চেইনটা অসীম সংখ্যক মানুষ ধরে চলল, কখনো শেষ হলো না। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত আপনার বন্ধুর হাতে সত্যিই পাঁচশো টাকা আসবে? আসবে না। কারণ এই চেইনের মধ্যে কেউই আসলে নিজের পকেট থেকে টাকা দিচ্ছে না। প্রত্যেকেই অন্যের কাছ থেকে ধার নেওয়া টাকার ওপর নির্ভর করছে। চেইনটা যত লম্বাই হোক, এমনকি অসীম হলেও, আসল টাকাটা কোথাও থেকে তৈরি হচ্ছে না। টাকাটা সত্যিই আসতে হলে চেইনের কোথাও না কোথাও এমন একজনকে থাকতে হবে যার নিজের পকেটে সত্যিকারের টাকা আছে, যা তাকে আর কারো কাছ থেকে ধার করতে হয়নি।
এই ছোট্ট চিত্রটাই দর্শনের ইতিহাসের একটা সবচেয়ে গভীর যুক্তির মূল কথা ধরে রাখে। যুক্তিটার নাম বুরহান আল-সিদ্দিকিন (Burhan al-Siddiqin), তথা প্রুফ অফ দ্য ট্রুথফুল বা সত্যনিষ্ঠদের প্রমাণ। এটা দিয়েছেন দশম ও একাদশ শতকের মুসলিম দার্শনিক ও চিকিৎসক ইবনে সিনা (Avicenna, ৯৮০ থেকে ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দ), যাঁকে পশ্চিমে আভিসেনা নামে ডাকা হয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ইশারাত ওয়াত-তানবিহাত এবং আল-শিফায় তিনি এই যুক্তিটা বিস্তারিতভাবে সাজান। পরে খ্রিস্টান, ইহুদি আর মুসলিম দার্শনিকদের হাত ধরে এই যুক্তির নানা সংস্করণ ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি অনেক আধুনিক পশ্চিমা দার্শনিকও এটাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিগুলোর একটা বলে মনে করেন।
প্রথমে বুঝে নেওয়া যাক দুটো শব্দ, যেগুলো এই যুক্তির ভিত্তি। ইবনে সিনা সবকিছুকে দুই ভাগে ভাগ করেন। এক ভাগে আছে সেই সত্তা, যার নিজের স্বরূপই তার অস্তিত্বের কারণ। অর্থাৎ, এই সত্তার না থাকা অসম্ভব, কারণ তার থাকা তার নিজের প্রকৃতির মধ্যেই অন্তর্নিহিত। আরবিতে এটাকে বলে ওয়াজিব আল-ওজুদ, বাংলায় আবশ্যিক বা প্রয়োজনীয় সত্তা (necessary existent)। আর অন্য ভাগে আছে সেই সব জিনিস, যাদের স্বরূপ নিজে থাকা আর না থাকার ব্যাপারে নিরপেক্ষ। অর্থাৎ, এরা থাকতেও পারত, না থাকতেও পারত। আরবিতে এটাকে বলে মুমকিন আল-ওজুদ, বাংলায় সম্ভাব্য সত্তা (contingent existent)।
আপনার নিজের কথা ভাবুন। আপনি কি থাকতেই বাধ্য ছিলেন? না। আপনার বাবা-মা যদি কোনোদিন একে অপরের সাথে দেখা না করতেন, আপনি জন্মাতেনই না। আপনার হাতের চায়ের কাপটাও তাই। এই কাপের স্বরূপ, অর্থাৎ কাপ আসলে কী, তার মধ্যে এমন কিছু নেই যা বলে দেয় এই কাপটাকে থাকতেই হবে। এটা না থাকলেও কোনো সমস্যা হতো না বাস্তবতায়। তাই আপনি, আমি, এই কাপ, এই পৃথিবী, সবকিছুই সম্ভাব্য সত্তা। প্রত্যেকেই থাকার জন্য নিজের বাইরে কারো না কারো ওপর নির্ভর করছে।
এখন ইবনে সিনার মূল চাল আসে। তিনি বলেন, পৃথিবীতে যত সম্ভাব্য সত্তা আছে বা ছিল বা থাকবে, সবগুলোকে একসাথে একটা পুরো সংকলন হিসেবে কল্পনা করুন। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের প্রতিটা সম্ভাব্য জিনিস মিলিয়ে এই পুরো সংকলনটা। এই পুরো সংকলনটাও কি নিজে থেকে নিজের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে পারে? পারে না। কারণ এই সংকলনের প্রতিটা সদস্যই সম্ভাব্য, অর্থাৎ প্রত্যেকেই থাকার জন্য নিজের বাইরে কিছুর ওপর নির্ভরশীল। কোনো সদস্যই নিজের পকেট থেকে অস্তিত্ব দিচ্ছে না, সবাই ধার করছে। এখানেই আমাদের ধার-করা টাকার চেইনের চিত্রটা পুরোপুরি খাটে। চেইনটা যত লম্বাই হোক, এমনকি অসীম সংখ্যক সদস্য থাকলেও, পুরো চেইনটা মিলে তখনো ধার-করা অস্তিত্বের ওপরই নির্ভরশীল থেকে যায়। অসীম সংখ্যক ধার মিলিয়ে কখনো একটা স্বনির্ভর ব্যাংক তৈরি হয় না। তাই এই পুরো সংকলনের অস্তিত্বের আসল উৎস সংকলনের বাইরে থেকেই আসতে হবে। আর সেই উৎস নিজে যদি সম্ভাব্য হতো, তাহলে সেটা তো সংকলনেরই আরেকজন সদস্য হয়ে যেত, এবং প্রশ্নটা আবার সেই জায়গায় ফিরে আসত। তাই সেই চূড়ান্ত উৎসকে অবশ্যই এমন কিছু হতে হবে যার অস্তিত্ব একদমই ধার-করা নয়, যা নিজের স্বরূপেই অস্তিত্বশীল। অর্থাৎ, একটা আবশ্যিক সত্তা।
এই আবশ্যিক সত্তা সম্পর্কে ইবনে সিনা আরও কিছু যুক্তি দেন। যদি দুইটা আবশ্যিক সত্তা থাকত, তাহলে তাদের মধ্যে একটা পার্থক্যকারী বৈশিষ্ট্য থাকতে হতো যা একটাকে অন্যটা থেকে আলাদা করে। কিন্তু সেই বৈশিষ্ট্যটা তখন সত্তাটার নিজের ভেতরের একটা অতিরিক্ত অংশ হয়ে যায়, যার ওপর সত্তাটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আর যা কোনো অংশের ওপর নির্ভরশীল, তা তো আর বিশুদ্ধভাবে আবশ্যিক নয়, সেটা তখন নিজেই সম্ভাব্য হয়ে যায়। তাই আবশ্যিক সত্তা একটাই হতে পারে, একদম সরল ও অবিভাজ্য, কোনো অংশ নেই যার ওপর এটা নির্ভর করে। এই সত্তাকে কোনো কিছু সৃষ্টি করেনি, কারণ তার নিজের অস্তিত্বই তার স্বরূপে অন্তর্নিহিত। সবকিছুর অস্তিত্ব শেষ পর্যন্ত এই একক, সরল, চিরস্থায়ী সত্তার কাছ থেকেই ধার-করা। ইবনে সিনা এরপর আরও যুক্তি সাজিয়ে দেখান এই সত্তার জ্ঞান, ইচ্ছা ও ক্ষমতা থাকতে হবে। এটাই তিনি ও পরবর্তী মুসলিম দার্শনিকেরা স্রষ্টা বলে চিহ্নিত করেন।
একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে, এই যুক্তির নাম কেন সত্যনিষ্ঠদের প্রমাণ? ইবনে সিনা মনে করতেন, পাঁচটা ইন্দ্রিয় দিয়ে জগতের কোনো বিশেষ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে শুরু করা যুক্তি, যেমন গতি বা নকশা দেখে শুরু করা যুক্তি, কেউ চাইলে সেই পর্যবেক্ষণটাই নিয়ে সন্দেহ তুলতে পারে। কিন্তু এই যুক্তির শুরুর বিন্দুটা এতটাই মৌলিক যে একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ, নিজের মনের মধ্যে সৎভাবে তাকালে, কখনোই অস্বীকার করতে পারবে না যে অন্তত কিছু একটা অস্তিত্বশীল আছে, এমনকি যদি সেটা তার নিজের সন্দেহ করা মনটাই হয়। সেই একটামাত্র অনস্বীকার্য সত্য থেকেই, বিশুদ্ধ যুক্তির মাধ্যমে, বাকি পুরো কাঠামোটা দাঁড় করানো যায়। এই কারণেই পরবর্তী মুসলিম দার্শনিকেরা এই যুক্তিকে সবচেয়ে নিশ্চিত প্রমাণ বলে উঁচু মর্যাদা দিয়েছেন।
এখন এই যুক্তির বিরুদ্ধে যে আপত্তিগুলো এসেছে, সেগুলো দেখা যাক।
প্রথম আপত্তিটা আসে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের কাছ থেকে। কান্ট যুক্তি দিয়েছিলেন, অস্তিত্ব কোনো গুণ নয় যা একটা ধারণার সংজ্ঞার মধ্যে বসিয়ে দিয়ে কোনো জিনিসকে বাস্তবে আনা যায়। তিনি মূলত আনসেলমের অন্টোলজিকাল আর্গুমেন্টকে লক্ষ্য করেছিলেন, যেখানে বলা হয়, সবচেয়ে মহান কল্পনাযোগ্য সত্তার ধারণার মধ্যেই অস্তিত্ব অন্তর্ভুক্ত, তাই সে সত্তা থাকতেই হবে। কেউ কেউ মনে করেন ইবনে সিনার যুক্তিও একই দুর্বলতায় ভুগছে, কারণ এখানেও একটা ধারণা, আবশ্যিক সত্তা, থেকে অস্তিত্ব বের করা হচ্ছে। কিন্তু এই আপত্তিটা খেয়াল করলে দেখা যায়, ইবনে সিনার যুক্তি আনসেলমের যুক্তির মতো নয়। আনসেলম শুধু একটা ধারণা কল্পনা করেই শুরু করেন এবং সেই ধারণার সংজ্ঞা থেকেই অস্তিত্ব বের করার চেষ্টা করেন। ইবনে সিনা তা করেন না। তিনি শুরু করেন এই অনস্বীকার্য বাস্তব সত্য থেকে যে সম্ভাব্য জিনিস সত্যিই অস্তিত্বশীল আছে, আমাদের চারপাশে এবং আমাদের নিজেদের মধ্যে। তারপর সেই বাস্তব অস্তিত্বের দাবি থেকে যুক্তি এগিয়ে নিয়ে যান। দার্শনিকদের মধ্যে এই যুক্তিটাকে অন্টোলজিকাল বলা ঠিক, নাকি কসমোলজিকাল বলা ঠিক, তা নিয়ে আলোচনা চলে। কিন্তু যেটাই বলা হোক, যুক্তির ভিত্তি একটা খালি ধারণা নয়, বরং বাস্তবে অস্তিত্বশীল সম্ভাব্য জিনিসের উপস্থিতি। তাই কান্টের আসল আপত্তি, যা একদম খালি সংজ্ঞা থেকে অস্তিত্ব বের করাকে লক্ষ্য করেছিল, এখানে সরাসরি প্রযোজ্য হয় না।
দ্বিতীয় আপত্তিটা আসে পরবর্তী মুসলিম দার্শনিক মোল্লা সদরার মতো সমালোচকদের কাছ থেকে। তাঁদের বক্তব্য, প্রতিটা সদস্য সম্ভাব্য হলেই পুরো সংকলনটা সম্ভাব্য হয়ে যায়, এই অনুমানটা ভুল হতে পারে। হতে পারে পুরো সংকলনটা আলাদা একটা জিনিস, যার নিজস্ব নিয়ম প্রতিটা সদস্যের নিয়ম থেকে আলাদা। এটাকে দর্শনে বলা হয় কম্পোজিশনের ভুল, অর্থাৎ অংশের বৈশিষ্ট্য থেকে পুরো জিনিসের বৈশিষ্ট্য ধরে নেওয়ার ভুল। কিন্তু এই আপত্তির জবাবে বলা দরকার, ইবনে সিনার দাবিটা আসলে এতটা সহজ নয় যে পুরো সংকলনটাকে একটা সদস্যের মতো একই ধরনের একটা বস্তু বলে দাবি করা হচ্ছে। দাবিটা বরং এই, এই সংকলনের ভেতরে, যতদূর খুঁজে দেখা যায়, এমন কোনো সদস্য নেই যে নিজেই নিজের অস্তিত্বের পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারে। প্রতিটা সদস্যকে, একটা একটা করে পরীক্ষা করলে, দেখা যায় প্রত্যেকেই নিজের বাইরের কিছুর ওপর নির্ভরশীল। তাই পুরো সংকলনের ভেতরে কোথাও খুঁজলেও স্বনির্ভরতার কোনো উৎস পাওয়া যায় না। সংকলনটা যত বড়ই হোক, এমনকি অসীম হলেও, এই সমস্যাটা থেকে যায়। সুতরাং ব্যাখ্যাটা সংকলনের বাইরেই খুঁজতে হবে, এটা কম্পোজিশনের ভুল নয়, এটা শুধু এই পর্যবেক্ষণ যে নির্ভরশীল জিনিস যতই জমা করা হোক, তা থেকে কখনো স্বনির্ভরতা তৈরি হয় না।
তৃতীয় আপত্তিটা আসে কিছু আধুনিক দার্শনিকের কাছ থেকে, যাঁদের মধ্যে আছেন বারট্রান্ড রাসেল এবং গ্রাহাম অপি। তাঁদের বক্তব্য, হয়তো পুরো মহাবিশ্বটাই, বা পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মগুলোই, নিজেই সেই আবশ্যিক সত্তা। মহাবিশ্ব শুধু আছে, এটাই চূড়ান্ত সত্য, আর কোনো ব্যাখ্যা দরকার নেই। কিন্তু এই যুক্তির নিজের সংজ্ঞা অনুযায়ী আবশ্যিক সত্তাকে একদম সরল হতে হবে, এমন কিছু যা অন্য কোনোভাবে হতে পারত না। মহাবিশ্বের বেলায় ঠিক তার বিপরীত ছবিটাই দেখা যায়। মহাবিশ্ব অসংখ্য আলাদা আলাদা অংশ নিয়ে গঠিত, এর মৌলিক ধ্রুবকগুলো ভিন্ন মান নিয়েও থাকতে পারত বলে পদার্থবিজ্ঞানীরাই মনে করেন, এবং আধুনিক কসমোলজির অনেক মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের একটা সূচনাবিন্দু ছিল। যা অন্যভাবে হতে পারত, তা সংজ্ঞা অনুযায়ীই সম্ভাব্য, আবশ্যিক নয়। তাই মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যার শেষ বিন্দু ঘোষণা করা কোনো পাল্টা যুক্তি নয়, এটা স্রেফ ঘোষণা। আমরা জগতের প্রতিটা অংশের ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটা তুলি, কেন এটা অন্যভাবে হলো না, মহাবিশ্বের বেলায় সেই একই প্রশ্ন তোলা বন্ধ করে দেওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
এই যুক্তিটা পড়তে গিয়ে একটা জিনিস সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। কুরআনের আয়াতুল কুরসিতে স্রষ্টাকে একটা বিশেষ নামে ডাকা হয়েছে, আল-কাইয়ুম। এই নামের অর্থ হলো যিনি নিজের মধ্যে, নিজের শক্তিতেই টিকে থাকেন, আর বাকি সবকিছু তাঁর ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে। এটা ঠিক সেই ধারণা, যা ইবনে সিনা শত শত বছরের দর্শনচর্চা আর যুক্তির মধ্য দিয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন, একটা সত্তা যার নিজের অস্তিত্ব কারো কাছ থেকে ধার-করা নয়, আর বাকি সব সম্ভাব্য জিনিস যার কাছ থেকে তাদের অস্তিত্ব ধার করে। দর্শন এখানে একটা দীর্ঘ যুক্তির পথ ধরে যা খুঁজে পায়, কুরআন সেটাকেই একটা নামে, একদম সরাসরি, সবার জন্য সহজবোধ্য করে বলে দিয়েছে। দুটো পথ আলাদা, কিন্তু উপসংহার একই জায়গায় গিয়ে মেলে।


