থমিস্টিক প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)
বিশ্বাস ও দর্শন · ১৩ অক্টোবর ২০২৬

থমিস্টিক প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)

আপনি কি কখনো কোনো জিনিসের পুরো নকশা মাথায় এঁকে ফেলেছেন, যে জিনিসটা বাস্তবে নেই?

ধরুন, আপনি একটা উড়ন্ত গাড়ির কথা কল্পনা করলেন। রঙ কী হবে, চাকা কোথায় থাকবে, কীভাবে উড়বে, ভেতরে কী কী থাকবে — সবকিছু নিখুঁতভাবে বর্ণনা করে ফেললেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই বর্ণনা থেকেই কি বোঝা যায় গাড়িটা আসলে আছে কিনা? না। আপনি পুরো জিনিসটা কী, তা জানলেন, কিন্তু জিনিসটা সত্যিই আছে কিনা, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা প্রশ্ন। এই ছোট্ট পার্থক্যটাই (অর্থাৎ, "জিনিসটা কী" আর "জিনিসটা আছে কিনা") একটা প্রাচীন যুক্তির ভিত্তি, যা দিয়ে বহু দার্শনিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। আজ আমরা কথা বলব থমাস অ্যাকুইনাসের দর্শনের উপর ভিত্তি করে আধুনিক দার্শনিক এডওয়ার্ড ফেজার তাঁর "Five Proofs of the Existence of God" বইয়ে যে যুক্তিটা দিয়েছেন তা নিয়ে। একে বলা হয় "থমিস্টিক প্রমাণ" (Thomistic Proof)।

প্রথমে বুঝে নেওয়া যাক দুটো শব্দ। দর্শনের ভাষায় একটা জিনিসের "স্বরূপ" (essence) মানে হলো সেই জিনিসটা আসলে কী — তার সংজ্ঞা, তার ধরন, তাকে অন্য সবকিছু থেকে আলাদা করে তোলে এমন বৈশিষ্ট্য। আর "অস্তিত্ব" (existence) মানে হলো সেই জিনিসটা বাস্তবে আছে কিনা। সিংহের কথা ভাবুন। সিংহ কী? চার পায়ের, গর্জনকারী, মাংসাশী একটি প্রাণী। এটা আপনি পুরোপুরি জানেন। এই জ্ঞানটা থাকার জন্য আপনার জানার দরকার নেই পৃথিবীতে এখন সত্যিই কোনো সিংহ জীবিত আছে কিনা। এখন ধরুন ইউনিকর্নের কথা। একশিংওয়ালা ঘোড়ার মতো একটি কাল্পনিক প্রাণী। আপনি তার স্বরূপও পুরোপুরি বর্ণনা করতে পারেন, কিন্তু বাস্তবে এমন প্রাণী নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে, একটা জিনিসের "কী" এবং তা "আছে কিনা" এই দুটো প্রশ্ন একরকম নয়। এই পার্থক্যকে অ্যাকুইনাস এবং ফেজার বলছেন "বাস্তব পার্থক্য" (real distinction)। অর্থাৎ, এটা শুধু আমাদের মনের খেলা নয়, এটা বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকা একটা সত্যিকারের ফারাক।

এখন প্রশ্ন হলো — যদি একটা জিনিসের স্বরূপের মধ্যে অস্তিত্ব অন্তর্নিহিত না থাকে, তাহলে সে অস্তিত্ব পায় কোথা থেকে? এখানেই যুক্তির মূল বক্তব্য শুরু। যে জিনিসের স্বরূপ আর অস্তিত্ব আলাদা, তার অস্তিত্বটা তাকে বাইরে থেকে কেউ না কেউ দিচ্ছে এবং এই দেওয়াটা শুধু একবারের জন্য নয়, বরং প্রতি মুহূর্তে, যতক্ষণ জিনিসটা টিকে থাকছে।

এই "প্রতি মুহূর্তে" ব্যাপারটা একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝা সহজ। একটা বাল্ব জ্বলছে কারণ বিদ্যুৎ তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিলে বাল্ব সঙ্গে সঙ্গে নিভে যায় — বাল্বের নিজের মধ্যে আলো জ্বালিয়ে রাখার কোনো ক্ষমতা নেই, সে শুধু বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল, এবং সেই নির্ভরতা প্রতিটা সেকেন্ডে চলমান। এটা একটা বিলিয়ার্ড বলকে ঠেলে দেওয়ার মতো নয়, যেখানে একবার ঠেলা দিলে বল নিজের গতিতে চলতে থাকে। অ্যাকুইনাসের যুক্তি অনুযায়ী, যে কোনো জিনিসের অস্তিত্বও এরকম। এটা একবার "চালু" করে দিলে নিজে নিজে চলতে থাকে না, বরং প্রতি মুহূর্তে কোনো না কোনো উৎস থেকে অস্তিত্ব "সরবরাহ" পেতে হয়।

এখন সেই উৎসটা কী? দুটো সম্ভাবনা। এক, সেই উৎসও হতে পারে এমন একটা জিনিস, যার নিজেরও স্বরূপ আর অস্তিত্ব আলাদা। মানে সেও নিজের অস্তিত্বের জন্য আরও কারো ওপর নির্ভরশীল। দুই, উৎসটা হতে পারে এমন কিছু, যার মধ্যে স্বরূপ আর অস্তিত্বে কোনো ফারাক নেই। অর্থাৎ, যার "কী হওয়া" আর "থাকা" একই জিনিস। এই দ্বিতীয় রকমের সত্তাকে বলা হয় "স্বতঃনির্ভর স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্ব" (subsistent existence itself) — এমন একটা সত্তা, যার প্রকৃতিই হলো অস্তিত্বশীল হওয়া, যাকে অস্তিত্ব পাওয়ার জন্য কারো দিকে তাকাতে হয় না।

যদি প্রথম সম্ভাবনাটাই সত্যি হয়। মানে প্রতিটা উৎসও আরেকটা নির্ভরশীল জিনিস হয়, তাহলে কী হবে? এখানে দুই রকম কার্যকারণ-শৃঙ্খলের মধ্যে ফেজার একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টানেন । একটা হলো "পার সে" (per se) শৃঙ্খল — যেখানে প্রতিটা ধাপ এই মুহূর্তে, একসঙ্গে কাজ করছে, একে অপরকে ধরে রেখেছে। যেমন একটা শিকলে বাঁধা ঝাড়বাতি- প্রথম কড়াটা দ্বিতীয়টাকে ধরে রাখছে, দ্বিতীয়টা তৃতীয়টাকে, এবং এটা সব একসঙ্গে, এই মুহূর্তে ঘটছে। যদি সবচেয়ে উপরের আংটাটা, যেটা ছাদের সাথে লাগানো, সরিয়ে ফেলা হয়, তাহলে পুরো শিকলটাই পড়ে যাবে। কোনো মধ্যবর্তী কড়ার নিজের মধ্যে ঝাড়বাতিটাকে ধরে রাখার ক্ষমতা নেই, তারা সবাই শুধু ওপরের শক্তিটা নিচে পাঠাচ্ছে। এর বিপরীতে আছে "পার অ্যাক্সিডেন্স" (per accidens) শৃঙ্খল। যেমন, বাপ-দাদার বংশ। দাদা মারা গেলেও বাবা জীবিত থাকতে পারে, বাবা মারা গেলেও সন্তান জীবিত থাকতে পারে। কারণ একবার জন্ম দেওয়ার কাজ শেষ হয়ে গেলে, আগের প্রজন্মের উপস্থিতি আর লাগে না। ফেজারের যুক্তি হলো, অস্তিত্ব দেওয়ার শৃঙ্খলটা প্রথম রকমের। অর্থাৎ, "পার সে" ধরনের। কারণ এটা প্রতি মুহূর্তে ঘটছে, অতীতের কোনো এক ঘটনা নয়। আর এই ধরনের শৃঙ্খল অসীম পর্যন্ত পেছানো যায় না, কারণ মধ্যবর্তী কোনো ধাপেরই নিজের ভেতরে অস্তিত্ব তৈরির ক্ষমতা নেই। তারা শুধু হাতবদল করছে। তাই শেষমেশ এমন একটা বিন্দুতে থামতেই হবে, যার নিজের মধ্যেই অস্তিত্ব আছে, যাকে ধরে রাখার জন্য কারো প্রয়োজন নেই। এই সত্তাকেই অ্যাকুইনাস এবং ফেজার বলছেন ঈশ্বর।

এটা মনে রাখা জরুরি যে এই প্রমাণটা মহাবিশ্বের শুরুর কথা বলছে না। এটা "কখন শুরু হলো" প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে না। এটা বলছে, এই মুহূর্তে, এখন, আপনার চারপাশের প্রতিটা জিনিস কেন অস্তিত্বে টিকে আছে, তার একটা ব্যাখ্যা থাকতে হবে। মহাবিশ্ব যদি অনন্তকাল ধরেই থাকত, তাতেও এই প্রশ্ন একইরকম থাকে — প্রতিটা জিনিসের নিজের স্বরূপে অস্তিত্ব অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই তাকে বাইরে থেকে পাওয়াতে হবেই, চিরকাল ধরেই হোক বা না হোক।

এখন আসি ভারসাম্যের দিকে। কারণ এই যুক্তিটা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিও আছে, এবং সেগুলো অগ্রাহ্য করার মতো নয়। দার্শনিক অ্যান্থনি কেনি (Anthony Kenny) একটা শক্তিশালী প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, "স্বরূপ জানলেও অস্তিত্ব জানা যায় না" — এই পর্যবেক্ষণটা আসলে আমাদের জ্ঞান বা ধারণা সম্পর্কে একটা সত্য, বাস্তবতার গঠন সম্পর্কে নয়। আমি ইউনিকর্নের ধারণা মাথায় রাখতে পারি অস্তিত্ব নিশ্চিত না করেই। কিন্তু এটা প্রমাণ করে না যে বাস্তব জিনিসের মধ্যে আসলেই দুটো আলাদা "উপাদান" আছে, একটা "স্বরূপ-উপাদান" আর একটা "অস্তিত্ব-উপাদান", যেগুলো জোড়া লাগানো হয়েছে। চতুর্দশ শতকের দার্শনিক জন বুরিদানও (John Buridan) প্রায় একই রকম আপত্তি তুলেছিলেন অনেক আগে। এই সমালোচকদের মূল বক্তব্য হলো- আমাদের মনের মধ্যে একটা ফাঁক থাকা, আর বাস্তবতার মধ্যে একটা ফাঁক থাকা, এই দুটো এক জিনিস নয়। একে বলা হয় "রিইফিকেশন সমস্যা" (reification problem)। অর্থাৎ, দুটো ধারণাকে যদি দুটো সত্যিকারের বস্তুর মতো ভাবা হয়, তাহলে ভুল হতে পারে। যেমন, "পানির আকার" আর "পানির ভেজাতে পারা”- এই দুটো আলাদা শব্দ হলেও, এগুলো যে পানি থেকে আলাদা করে বের করে আনা যাবে এমন দুটো বস্তু নয়।

থমিস্ট দার্শনিকদের জবাব হলো, তাঁরা স্বরূপ আর অস্তিত্বকে দুটো আলাদা "বস্তু" বলছেন না, যেগুলো লেগোর মতো জোড়া লাগানো হয়েছে। বরং তাঁরা বলছেন এগুলো একই সত্তার দুটো সত্যিকারের, কিন্তু অবিচ্ছেদ্য দিক। যেমন, একটা আপেলের রঙ আর তার আকৃতি সত্যিকারের দুটো আলাদা বৈশিষ্ট্য, কিন্তু আপনি আপেল থেকে রঙটাকে আলাদা একটা বস্তুর মতো কেটে বের করতে পারবেন না। সমালোচকরা পাল্টা বলেন, এই তুলনা যথেষ্ট নয়, কারণ রঙ আর আকৃতি দুটোই তো "আছে" বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে প্রথম থেকেই। আসল প্রশ্ন হলো "থাকা" নিজেই কি এমন একটা বৈশিষ্ট্য, যা যুক্ত বা বিযুক্ত করা যায়? কিছু আধুনিক যুক্তিবিদ, যেমন বারট্রান্ড রাসেলের ঘরানার দার্শনিকরা, বলেন "অস্তিত্ব" আসলে জিনিসের কোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এটা একটা যৌক্তিক অবস্থা। তাই পুরো প্রশ্নটাই ভুল জায়গা থেকে শুরু হয়েছে। আরেকটা সাধারণ আপত্তি হলো, মহাবিশ্ব বা তার মধ্যেকার জিনিসগুলোর অস্তিত্ব হয়তো একটা "নিরেট সত্য" (brute fact)। মানে এর আর কোনো ব্যাখ্যা খোঁজার দরকার নেই, জিনিসগুলো আছে, এটাই যথেষ্ট। থমিস্টরা এর জবাবে বলেন, যদি কোনো জিনিসের নিজের স্বরূপেই অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে তার “থাকা” বা “না-থাকা” দুটোই সমান সম্ভব ছিল (অর্থাৎ, contingent) এবং এরকম একটা জিনিস না থেকে কেনো থাকল, তা প্রশ্ন না করাটা অদ্ভুত লাগে। যদিও সমালোচকরা বলেন, এই "অদ্ভুত লাগা"টা একটা স্বজ্ঞা বা intuition, প্রমাণ নয়।

তাহলে এই যুক্তি কতটা জোরালো? এটা নির্ভর করে একটা বিষয়ে — আপনি কি মেনে নেন যে "স্বরূপ জানা আর অস্তিত্ব জানা আলাদা" থেকে সত্যিই প্রমাণ হয় যে বাস্তবতার মধ্যে একটা সত্যিকারের ফারাক আছে, না এটা শুধু আমাদের ভাষা আর চিন্তার সীমাবদ্ধতা? অ্যাকুইনাসের অনুসারীরা মনে করেন এটা বাস্তবতার গভীরে লুকানো একটা সত্য, যেটা শেষ পর্যন্ত আমাদের এমন একটা সত্তার দিকে নিয়ে যায় যার অস্তিত্ব ধার করা নয়, বরং যে নিজেই অস্তিত্ব। সমালোচকরা মনে করেন, এই পুরো দালানটা একটা ভাষাগত কৌশলের উপর দাঁড়িয়ে আছে, যেটাকে বাস্তবতার একটা গভীর সত্য বলে ভুল করা হচ্ছে।

আপনার চারপাশে একবার তাকান — আপনার হাতের চায়ের কাপ, জানালার বাইরের গাছ, এমনকি আপনি নিজে। এদের প্রত্যেকের একটা সম্পূর্ণ বর্ণনা দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সেই বর্ণনার মধ্যে কোথাও লেখা নেই যে এটা থাকতেই হবে। তাহলে এরা আছে কেন, না থাকার বদলে? এই প্রশ্নটা কি আপনার কাছে একটা গভীর রহস্য মনে হয় না, যার একটা উত্তর থাকা উচিত?

দর্শন #স্রষ্টার অস্তিত্বের যুক্তি
আরও পড়ুন

একই বিষয়ে আরও লেখা

অচল চালক ও প্রথম কারণ: অ্যারিস্টটলের যুক্তি
বিশ্বাস ও দর্শন · ২০ অক্টোবর ২০২৬

অচল চালক ও প্রথম কারণ: অ্যারিস্টটলের যুক্তি

আপনার হাতে একটা লাঠি আছে, আর সেই লাঠি দিয়ে আপনি একটা পাথর ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন। পাথরটা নড়ছে কেন? কারণ লাঠিটা তাকে ধাক্কা দিচ্ছে। লাঠিটা নড়ছে কেন? কারণ আপনার হাত তাকে…

রেশনালিস্ট প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)
বিশ্বাস ও দর্শন · ১৬ অক্টোবর ২০২৬

রেশনালিস্ট প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)

ধরুন, আপনি রাতে একা বাসায় ফিরলেন, এবং রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন চুলার উপর একটা কেটলিতে পানি টগবগ করে ফুটছে। আপনার মাথায় কী আসবে? "কেটলিটা এমনি এমনি ফুটছে, এর পেছনে কোনো…

অগাস্টিনিয়ান প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)
বিশ্বাস ও দর্শন · ৯ অক্টোবর ২০২৬

অগাস্টিনিয়ান প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)

২ + ২ = ৪। এই সত্যটা নিয়ে একটু ভাবুন। এই সত্য কি আজ সত্য, গতকালও সত্য ছিল, আর হাজার বছর পরেও সত্য থাকবে — এমনকি যদি পৃথিবীতে একটাও মানুষ না থাকে, একটাও মস্তিষ্ক এই…