পূর্ণতার মাত্রার যুক্তি: অ্যাকুইনাসের চতুর্থ পথ
বিশ্বাস ও দর্শন · ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পূর্ণতার মাত্রার যুক্তি: অ্যাকুইনাসের চতুর্থ পথ

পূর্ণতার মাত্রার যুক্তি: "ভালো", "আরও ভালো", "সবচেয়ে ভালো" – এই তুলনাটা করতে গেলে কি আমাদের একটা অদৃশ্য মাপকাঠি লাগে?

একটু ভাবুন তো – আপনি যখন বলেন "উনি খুব সৎ মানুষ, কিন্তু ঐ ভদ্রলোক তার চেয়েও সৎ", তখন আপনার মাথায় আসলে কী ঘটছে? আপনি দুজন মানুষকে মেপে দেখছেন, আর একজনকে অন্যজনের চেয়ে "সততার দিক দিয়ে এগিয়ে" রাখছেন। কিন্তু এই এগিয়ে-পিছিয়ে থাকার হিসাবটা করতে গেলে আপনার মনে কি এমন একটা ধারণা কাজ করছে না যে – কোথাও একটা "পুরোপুরি সৎ" বলে কিছু একটা আছে, যার সাথে তুলনা করেই আমরা কাউকে কম বা বেশি সৎ বলছি? একই কথা খাটে যখন আমরা বলি একটা ছবি আরেকটার চেয়ে "বেশি সুন্দর", একটা যুক্তি আরেকটার চেয়ে "বেশি সত্য", বা একটা কাজ আরেকটার চেয়ে "বেশি মহৎ"। প্রতিটা ক্ষেত্রেই আমরা যেন একটা অদৃশ্য স্কেলে জিনিসগুলোকে বসাচ্ছি, আর সেই স্কেলের একটা প্রান্তে আছে "সম্পূর্ণ", "চূড়ান্ত", "সর্বোচ্চ" কিছু একটা – যদিও বাস্তবে আমরা হয়তো কখনো সেই চূড়ান্ত জিনিসটা চোখে দেখিনি। এখন প্রশ্ন হলো – এই তুলনা করার ক্ষমতাটা কি স্রেফ আমাদের মনের একটা খেলা, নাকি এর পেছনে সত্যিই বাস্তবে এমন কিছু থাকা দরকার যেটা "সর্বোচ্চ পূর্ণতা" ধারণ করে? এই প্রশ্নটাই থমাস আকুইনাসের বিখ্যাত "পাঁচটি পথ"-এর চতুর্থ পথের মূল কথা – "পূর্ণতার মাত্রার যুক্তি" (Argument from Degrees of Perfection), যাকে অনেকে "গ্রেডেশনের যুক্তি" (Argument from Gradation)-ও বলেন। আগের তিন পর্বে আমরা দেখেছি পরিবর্তনের যুক্তি, নিমিত্ত কারণের যুক্তি, আর সময়-সম্ভাব্যতার যুক্তি – আজকের এই চতুর্থ পথটা আগের তিনটার চেয়ে একেবারে আলাদা স্বাদের, কারণ এটা কার্যকারণ নয়, বরং তুলনা আর মূল্যবোধ নিয়ে কথা বলে।

যুক্তিটা কোথা থেকে এলো

আকুইনাস তার "সুম্মা থিওলজিকা" গ্রন্থের প্রথম ভাগে (প্রশ্ন ২, অনুচ্ছেদ ৩) এই চতুর্থ পথটা শুরু করেন একটা সাধারণ পর্যবেক্ষণ দিয়ে – আমরা জিনিসের মধ্যে "কম-বেশি" পার্থক্য দেখি। কিছু জিনিস অন্য জিনিসের চেয়ে বেশি ভালো, বেশি সত্য, বেশি মহৎ – এভাবেই আমরা কথা বলি প্রতিদিন। আকুইনাস এখানে অ্যারিস্টটলের একটা নীতি ধার করেন – কোনো একটা গুণের তুলনা তখনই সম্ভব যখন সেই গুণটা কোনো না কোনো "সর্বোচ্চ মাত্রার" সাথে তুলনা করে মাপা হয়। যেমন কোনো জিনিস "বেশি গরম" তখনই বলা যায় যখন সেটা সবচেয়ে গরম জিনিসটার (আগুনের) কাছাকাছি থাকে। আকুইনাসের মূল দাবিটা হলো – "সত্তা" (being), "ভালোত্ব" (goodness), "সত্যতা" (truth), আর "মহত্ত্ব" (nobility) – এই গুণগুলোর ক্ষেত্রেও একই যুক্তি খাটে। যেহেতু জিনিসগুলো এসব গুণে কম-বেশি অংশীদার, তাই কোথাও একটা এমন কিছু থাকতে হবে যেটা এই গুণগুলোর সর্বোচ্চ মাত্রায় ধারণ করে, আর সেটাই বাকি সবকিছুতে ঐ গুণের উৎস।

মূল ধারণা সহজ ভাষায়

আকুইনাস অ্যারিস্টটলের একটা উদাহরণ ব্যবহার করেন – আগুন হলো সবচেয়ে গরম জিনিস, আর প্রাচীন পদার্থবিজ্ঞানের ধারণা অনুযায়ী আগুনই অন্য জিনিসকে গরম করে তোলে, অর্থাৎ যে গুণে আগুন সর্বোচ্চ মাত্রায় আছে, সেই গুণটা আগুনই অন্য জিনিসে সঞ্চার করে। এখন এই একই যুক্তি যদি "ভালোত্ব" বা "সত্যতা"-র মতো গুণে প্রয়োগ করি, তাহলে দাঁড়ায় – যেহেতু জগতে জিনিস কম-বেশি ভালো, কম-বেশি সত্য, কম-বেশি পূর্ণ, তাই কোথাও একটা সত্তা থাকতে হবে যেটা সর্বোচ্চ মাত্রায় ভালো, সর্বোচ্চ মাত্রায় সত্য, সর্বোচ্চ মাত্রায় পূর্ণ – আর সেই সর্বোচ্চ সত্তাই বাকি সব কিছুর মধ্যে এই গুণগুলোর কারণ। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা কাজ করে, যেটাকে দর্শনে বলে "অংশগ্রহণ" বা "পার্টিসিপেশন" (participation) – প্লেটোর কাছ থেকে ধার করা একটা ধারণা, যদিও আকুইনাস নিজে অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের অনুসারী। ধারণাটা এমন – যে জিনিস কোনো গুণ পুরোপুরি নিজে থেকে ধারণ করে না, বরং আংশিকভাবে ধারণ করে, সেটা আসলে সেই গুণের একটা উৎস থেকে "ধার" নিচ্ছে, "অংশ" নিচ্ছে। একটা মোমবাতির আলো যেমন সূর্যের আলোর একটা ক্ষীণ প্রতিফলন না হলেও, তুলনামূলকভাবে বোঝার জন্য বলা যায়। ঠিক তেমনি, আংশিক ভালোত্ব বা আংশিক সত্যতা যেন পূর্ণ ভালোত্ব বা পূর্ণ সত্যতার একটা "ছায়া" বা "অংশ"। আকুইনাসের যুক্তিতে এই সর্বোচ্চ পূর্ণতার উৎসটাই ঈশ্বর।

যুক্তির কাঠামো

পুরো যুক্তিটা ধাপে ধাপে এভাবে সাজানো যায়:

১) আমরা জিনিসের মধ্যে গুণের কম-বেশি মাত্রা দেখি – কিছু জিনিস অন্যের চেয়ে বেশি ভালো, বেশি সত্য, বেশি মহৎ, বেশি পূর্ণ (এগুলোকে দর্শনে বলে "ট্রান্সেন্ডেন্টাল" বা অতিক্রমী গুণ – কারণ এগুলো সত্তার সাথেই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত)।

২) কোনো গুণের তুলনামূলক মাত্রা বোঝা যায় শুধু তখনই, যখন সেই গুণের একটা সর্বোচ্চ মান বা মানদণ্ডের সাথে তুলনা করা হয় – যেমন "বেশি গরম" বোঝা যায় "সবচেয়ে গরম"-এর সাপেক্ষে।

৩) সুতরাং যেহেতু জিনিস কম-বেশি ভালো, সত্য, মহৎ, পূর্ণ, তাই কোথাও একটা এমন কিছু থাকতে হবে যেটা সর্বোচ্চ মাত্রায় ভালো, সত্য, মহৎ, পূর্ণ – অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে সত্তাশীল।

৪) যে জিনিস কোনো গুণে সর্বোচ্চ মাত্রায় থাকে, সেটাই সেই গুণের উৎস হিসেবে বাকি সবকিছুতে সেই গুণ সঞ্চার করে (অ্যারিস্টটলের নীতি অনুযায়ী)।

৫) সুতরাং একটা এমন সত্তা থাকতে হবে যেটা সব জিনিসের ভালোত্ব, সত্যতা, মহত্ত্ব আর সত্তার (being) কারণ।

৬) এই পরম পূর্ণ সত্তাকেই আকুইনাস বলেন ঈশ্বর।

একটা জরুরি স্পষ্টীকরণ – এটা যেকোনো গুণ নিয়ে না

এই যুক্তিটা নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি হয় এইখানে – অনেকে ভাবেন আকুইনাস বলছেন, জগতে যেকোনো গুণের তুলনা করলেই একটা "সর্বোচ্চ উদাহরণ" থাকতে হবে। নাস্তিক রিচার্ড ডকিন্স তার "দ্য গড ডিলিউশন" বইতে ঠিক এই আপত্তিটাই তোলেন – তিনি বলেন, মানুষ কম-বেশি "দুর্গন্ধময়" হতে পারে, তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে কোথাও একটা "সবচেয়ে দুর্গন্ধময় সত্তা" থাকতে হবে, আর সেটাই ঈশ্বর? এই ব্যঙ্গাত্মক উদাহরণ দিয়ে ডকিন্স যুক্তিটাকে হাস্যকর বানানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আধুনিক থোমিস্ট দার্শনিক এডওয়ার্ড ফেজার (Edward Feser) দেখান যে এটা মূল যুক্তিটাকেই ভুল বোঝা। কারণ, আকুইনাস দুর্গন্ধ, স্বাদ, রং-এর মতো এলোমেলো, আপেক্ষিক, বস্তুনির্ভর গুণ নিয়ে কথা বলছেন না। তিনি কথা বলছেন নির্দিষ্ট কিছু "ট্রান্সেন্ডেন্টাল" গুণ নিয়ে, যেমন- সত্তা, ভালোত্ব, সত্যতা, মহত্ত্ব। এগুলোকে মধ্যযুগীয় দর্শনে সত্তার সাথেই অভিন্ন বলে গণ্য হয়, আর যেগুলোর একটা নির্দিষ্ট, বিশ্লেষণযোগ্য কাঠামো আছে বলে দাবি করা হয়। দুর্গন্ধ কোনো "ট্রান্সেন্ডেন্টাল" গুণ না, তাই এই যুক্তি সেখানে খাটেই না।

সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থন কী

এই যুক্তির আসল শক্তি এখানে যে এটা আমাদের নৈতিক আর মূল্যবোধ সংক্রান্ত ভাষার একটা গভীর অনুমানের দিকে আঙুল তোলে। আমরা যখন বলি হিটলারের কাজ নিরো-র চেয়েও নিষ্ঠুর ছিল, বা মাদার তেরেসার কাজ একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি মহৎ ছিল, তখন আমরা যেন ধরেই নিচ্ছি যে নিষ্ঠুরতা বা মহত্ত্বের একটা বাস্তব, বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড আছে – এটা স্রেফ ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় না। যদি নৈতিকতা বা সত্য নিছক আপেক্ষিক হতো, তাহলে "বেশি ভালো" বলাটাই অর্থহীন হয়ে যেত – ঠিক যেমন "বেশি লাল" বলার কোনো মানে হয় না যদি লাল রঙের কোনো নির্দিষ্ট মান না থাকে। এই যুক্তি তাই নৈতিক বাস্তববাদ (moral realism)-এর একটা আধিভৌতিক ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করে। এটি বলে যে আমাদের মূল্যবোধের ভাষা নিছক কল্পনা না, বরং বাস্তবতার একটা গভীর কাঠামোর প্রতিফলন। আর যদি এই পূর্ণতার একটা চূড়ান্ত উৎস থাকে, তাহলে সেটা একইসাথে আগের তিনটা পথে পাওয়া "প্রথম কারণ" আর "আবশ্যিক সত্তা"-র সাথেও মিলে যায়। যেন সবগুলো পথ একই সিদ্ধান্তের দিকে বিভিন্ন কোণ থেকে এগিয়ে আসছে।

এবার আসি সমালোচনার দিকে

প্রথম আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিটা আসে দার্শনিক অ্যান্টনি কেনির (Anthony Kenny) কাছ থেকে। কেনি বলেন, আকুইনাস যে ধরে নেন "সর্বোচ্চ মাত্রার জিনিসটাই বাকি সবকিছুতে সেই গুণ সঞ্চার করে" – এই নীতিটা আসলে অ্যারিস্টটলের সেকেলে পদার্থবিজ্ঞান থেকে ধার করা, যেখানে ভাবা হতো আগুনই তাপের উৎস। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের দেখায়, তাপ আসলে অণুর গতি, আগুন কোনো বিশেষ "তাপের মূল ভান্ডার" না। তাই যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর এই সাদৃশ্যটা দাঁড়িয়ে, সেটাই এখন ভুল প্রমাণিত। এখান থেকে কেনির মূল অভিযোগ – সাদৃশ্য বা তুলনা থেকে কার্যকারণ অনুমান করাটাই একটা ভুল লাফ; দুটো জিনিস একই গুণে অংশীদার হলেই তার মানে এই না যে একটা আরেকটার কারণ। ফেজারের মতো থোমিস্টরা জবাব দেন যে আকুইনাসের মূল যুক্তিটা আসলে অ্যারিস্টটলের নির্দিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল না, বরং একটা সাধারণ আধিভৌতিক নীতির ওপর নির্ভরশীল – যা কিছু কোনো পূর্ণতা কেবল আংশিকভাবে ধারণ করে, তাকে সেই পূর্ণতা কোনো বাহ্যিক উৎস থেকে পেতে হয়, কারণ সে নিজে থেকে সেই পূর্ণতার ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তবে সমালোচকরা বলেন, এই সাধারণ নীতিটা নিজেই একটা প্রমাণ ছাড়া অনুমান, যা মেনে নেওয়ার আগে আরও যুক্তির দরকার।

দ্বিতীয় আপত্তিটা হলো একটা যৌক্তিক ফাঁক নিয়ে – এমনকি যদি মেনেও নিই কোনো গুণের তুলনা করতে একটা "সর্বোচ্চ মানদণ্ড" লাগে, তার মানে এই না যে সেই মানদণ্ডটা বাস্তবে অস্তিত্বশীল কোনো সত্তা হতে হবে, বা সেটাই বাকি সবকিছুর কারণ হতে হবে। একটা ক্লাসে সবচেয়ে লম্বা ছাত্রটা অন্য ছাত্রদের লম্বা বানায় না, সে স্রেফ তুলনার একটা রেফারেন্স পয়েন্ট মাত্র। একইভাবে "সবচেয়ে ভালো" ধারণাটা হয়তো নিছক একটা ধারণাগত মানদণ্ড (conceptual standard), বাস্তব কোনো কার্যকারণ সম্পর্কের উৎস না। এই আপত্তির জবাবে থোমিস্টরা বলেন, "ভালোত্ব" আর "সত্তা"-র ক্ষেত্রে ব্যাপারটা লম্বা হওয়ার মতো সাধারণ পরিমাপযোগ্য গুণের চেয়ে আলাদা, কারণ এখানে প্রশ্নটা কেবল তুলনা নিয়ে না, বরং কেন কোনো জিনিস আংশিকভাবে ভালো বা পূর্ণ হয়ে থাকতে পারে অথচ সম্পূর্ণ পূর্ণতা অর্জন করতে পারে না, তার ব্যাখ্যা নিয়ে।

তৃতীয় আপত্তিটা আসে নৈতিক দর্শনের দিক থেকে – আদৌ কি "সর্বোচ্চ ভালোত্ব" বলে কিছু আছে? মানুষ তো সহজ সহজ নৈতিক প্রশ্নেই একমত হতে পারে না – তাহলে একটা চূড়ান্ত, বস্তুনিষ্ঠ, সর্বোচ্চ ভালোত্বের ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত? হয়তো "ভালো" ধারণাটা সংস্কৃতি আর প্রেক্ষাপটভেদে আপেক্ষিক, কোনো একক পরম মানদণ্ডের দিকে নির্দেশ করে না। থোমিস্টরা পাল্টা বলেন, নৈতিক বিষয়ে মতভেদ থাকা মানেই এই না যে কোনো বস্তুনিষ্ঠ সত্য নেই – বিজ্ঞানের অনেক প্রশ্নেও বিজ্ঞানীরা দ্বিমত পোষণ করেন, তাতে বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠতা মিথ্যা হয়ে যায় না। তদুপরি, নৈতিক ভালত্যের যদি বস্তুনিষ্ঠ মানদন্ড না-ই থাকে, তাহলে হিটলার বা জেওদের কাজও জাস্টিফাইড দেখানো যায়।

চতুর্থ আপত্তিটা আগের পর্বগুলোর মতোই "অনন্যতার সমস্যা" – এমনকি যদি মেনেও নিই একটা "সর্বোচ্চ পূর্ণ সত্তা" থাকতে হবে, তার মানে এই না যে সেই সত্তার বুদ্ধি, ইচ্ছা, ব্যক্তিত্ব আছে, বা এটাই সেই ব্যক্তিগত ঈশ্বর যার কাছে মানুষ প্রার্থনা করে। আকুইনাস নিজে এই ফাঁকটা বুঝতেন বলেই সুম্মা থিওলজিকার পরবর্তী প্রশ্নগুলোতে আলাদাভাবে যুক্তি দেন কেন এই পরম পূর্ণ সত্তার মধ্যে জ্ঞান, ইচ্ছা, আর ব্যক্তিত্বের মতো গুণ থাকতে হবে। সমালোচকরা মনে করেন এই অতিরিক্ত ধাপগুলো মূল পাঁচটা পথের চেয়ে অনেক বেশি অনুমাননির্ভর, আর সেখানেই যুক্তির আসল দুর্বলতা লুকিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু, ধর্মগ্রন্থগুলোর মূল কথাকে সামনে নিয়ে আসলে দেখা যায়, এই সকল অনুমান একাধিক উৎস থেকে ভ্যালিডেটেড তথা একটা বিন্দুতেই ইঙ্গিত করে। ফলে সমালোকদের অর্থহীন সন্দেহবাতিকতা যৌক্তিক বোধের সাপেক্ষে ভিত্তিহীন মনে হয়।

শেষ কথা

আকুইনাসের এই চতুর্থ পথ আমাদের এমন একটা জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে যুক্তি আর নৈতিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় – আমরা প্রতিদিন মানুষকে, কাজকে, চিন্তাকে "ভালো" আর "মন্দ", "সত্য" আর "মিথ্যা" বলে বিচার করি, যেন কোথাও একটা নিখুঁত মানদণ্ড আছে যার সাপেক্ষে এই বিচার করা যায়। দর্শনে আলোচনা হয়, এই মানদণ্ডটা কি সত্যিই বাস্তবে কোথাও অস্তিত্বশীল, নাকি এটা স্রেফ আমাদের মনের একটা সুবিধাজনক কল্পনা, যা দিয়ে আমরা জগতকে বোঝার চেষ্টা করি? কিন্তু, যৌক্তিক চিন্তা এবং ধর্মীয় জ্ঞানের সমন্বয় করলে এই মানদন্ডের বাস্তবিক অস্তিত্ব এবং অস্তিত্বের উৎস হিসেবে স্রষ্টার অবস্থান পরিস্কার হয়ে যায়।

দর্শন #স্রষ্টার অস্তিত্বের যুক্তি
আরও পড়ুন

একই বিষয়ে আরও লেখা

অচল চালক ও প্রথম কারণ: অ্যারিস্টটলের যুক্তি
বিশ্বাস ও দর্শন · ২০ অক্টোবর ২০২৬

অচল চালক ও প্রথম কারণ: অ্যারিস্টটলের যুক্তি

আপনার হাতে একটা লাঠি আছে, আর সেই লাঠি দিয়ে আপনি একটা পাথর ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন। পাথরটা নড়ছে কেন? কারণ লাঠিটা তাকে ধাক্কা দিচ্ছে। লাঠিটা নড়ছে কেন? কারণ আপনার হাত তাকে…

রেশনালিস্ট প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)
বিশ্বাস ও দর্শন · ১৬ অক্টোবর ২০২৬

রেশনালিস্ট প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)

ধরুন, আপনি রাতে একা বাসায় ফিরলেন, এবং রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন চুলার উপর একটা কেটলিতে পানি টগবগ করে ফুটছে। আপনার মাথায় কী আসবে? "কেটলিটা এমনি এমনি ফুটছে, এর পেছনে কোনো…

থমিস্টিক প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)
বিশ্বাস ও দর্শন · ১৩ অক্টোবর ২০২৬

থমিস্টিক প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)

আপনি কি কখনো কোনো জিনিসের পুরো নকশা মাথায় এঁকে ফেলেছেন, যে জিনিসটা বাস্তবে নেই?