
রেশনালিস্ট প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)
ধরুন, আপনি রাতে একা বাসায় ফিরলেন, এবং রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন চুলার উপর একটা কেটলিতে পানি টগবগ করে ফুটছে। আপনার মাথায় কী আসবে? "কেটলিটা এমনি এমনি ফুটছে, এর পেছনে কোনো কারণ নেই" — এই কথাটা আপনার মাথায় আসবে না। আপনি সঙ্গে সঙ্গে ভাববেন, কেউ একজন চুলা জ্বালিয়েছে। এমনকি যদি বাসায় কেউ না থাকে, আপনি ধরে নেবেন কোনো টাইমার সেট করা ছিল, বা অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে। "এটা এমনি এমনি হয়েছে, কোনো কারণ খোঁজার দরকার নেই" — এই উত্তরটা আমরা কখনো মেনে নিই না। আমাদের মন সহজাতভাবেই বিশ্বাস করে, যা কিছু ঘটে বা যা কিছু আছে, তার পেছনে একটা ব্যাখ্যা থাকতেই হবে। এই সহজাত বিশ্বাসটাকে দর্শনের ভাষায় বলা হয় "পর্যাপ্ত কারণের নীতি" বা "প্রিন্সিপাল অব সাফিসিয়েন্ট রিজন" (Principle of Sufficient Reason, সংক্ষেপে PSR)। এবং এই নীতিটাকে ভিত্তি করে দার্শনিক এডওয়ার্ড ফেজার তাঁর "Five Proofs of the Existence of God" বইয়ের পঞ্চম ও শেষ প্রমাণটা দাঁড় করিয়েছেন — যাকে বলা হয় "রেশনালিস্ট প্রমাণ" (The Rationalist Proof)। আজ আমরা এই যুক্তিটা নিয়েই কথা বলব।
প্রথমে এই নীতিটা একটু ভালোভাবে বুঝে নেওয়া যাক। লাইবনিজ (Gottfried Leibniz) নামের জার্মান দার্শনিক এই নীতিটাকে বিখ্যাত করেছিলেন — তাঁর ভাষায়, প্রতিটা সত্য ঘটনার একটা পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা থাকতে হবে, নাহলে সেটা সত্য হতো না। ফেজার অবশ্য লাইবনিজের চেয়ে একটু সংকীর্ণ, পুরনো ধাঁচের সংস্করণ ব্যবহার করেন, যাকে বলা হয় "স্কলাস্টিক" সংস্করণ। এটা বলে যে, যা কিছু অস্তিত্বশীল, তার অস্তিত্বের একটা পর্যাপ্ত, উপযুক্ত ব্যাখ্যা থাকতে হবে, হয় তার নিজের ভেতরেই, না হয় তার বাইরে অন্য কিছুতে। কেন এই পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ? কারণ লাইবনিজের সংস্করণ সব "সত্য" বা "ফ্যাক্ট" নিয়ে কথা বলে, যা থেকে কিছু কঠিন যৌক্তিক জটিলতা তৈরি হয় — আমরা একটু পরে সেটা দেখব। ফেজার তাঁর সংস্করণটাকে শুধু "অস্তিত্ব" এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন, যাতে যুক্তিটা আরও শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়ায়।
এখন দুটো শব্দ বুঝে নেওয়া যাক — "আপতিক" (contingent) আর "আবশ্যিক" (necessary)। আপতিক সত্তা মানে এমন কিছু, যা থাকতে পারত, না-ও থাকতে পারত। আপনার হাতের মোবাইল ফোনটা আপতিক। অর্থাৎ, এটা না থাকলেও পারত, অন্য রকম হতে পারত, বা কখনো তৈরি না-ও হতে পারত। আপনি নিজেও আপতিক। কেননা, আপনার মা-বাবা না মিলিত হলে আপনি জন্মাতেন না। পুরো মহাবিশ্বও, বিজ্ঞান যতদূর বলে, আপতিক। এটা অন্যভাবে হতে পারত, বা নাও থাকতে পারত। অন্যদিকে আবশ্যিক সত্তা মানে এমন কিছু, যার না-থাকা অসম্ভব। যে নিজের স্বভাবগুণেই আছে, কারো উপর নির্ভর করে নেই। গণিতের সত্যকে অনেকে এরকম মনে করেন, যেমন ২+২=৪ — এটা যেকোনো পরিস্থিতিতেই সত্য, এর জন্য বাইরের কোনো কারণ লাগে না।
এবার মূল যুক্তিটা দেখা যাক। ধরুন একটা মালগাড়ির লম্বা লাইন, একটা বগি আরেকটা বগিকে টানছে, সেটা আরেকটাকে এবং এভাবে চলছে। এখন আপনাকে যদি বলা হয়, এই বগির লাইন অসীম দীর্ঘ, কোনো শুরু নেই, তাহলেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। তা হল পুরো লাইনটা আসলে চলছে কেন? প্রতিটা বগি তো শুধু সামনের বগির উপর নির্ভর করে, নিজের মধ্যে চলার ক্ষমতা কারো নেই। তাই লাইনটা যত লম্বাই হোক, যদি তার মধ্যে একটাও আসল ইঞ্জিন না থাকে, যার নিজের শক্তি আছে ও যাকে টানতে হয় না, তাহলে পুরো লাইনটাই নিশ্চল পড়ে থাকবে। ঠিক এই যুক্তিই রেশনালিস্ট প্রমাণের মূলে। প্রতিটা আপতিক সত্তার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা থাকে আরেকটা সত্তায়- আপনার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা আপনার মা-বাবায়, তাদের ব্যাখ্যা তাদের মা-বাবায়, এভাবে চলতেই থাকে। কিন্তু সব আপতিক সত্তাকে একসাথে নিয়ে, একটা পুরো "সমষ্টি" (totality) কল্পনা করুন — অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের সব আপতিক জিনিস মিলিয়ে। এই পুরো সমষ্টিটাও আপতিক, কারণ এর মধ্যে প্রতিটা সদস্যই আপতিক। তাহলে এই সমষ্টিরও একটা ব্যাখ্যা লাগবে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যাটা আরেকটা আপতিক সত্তা দিয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ তাহলে সেই সত্তাটাও তো সমষ্টির মধ্যেই পড়ে যাচ্ছে, এবং সমষ্টি নিজেকে নিজে ব্যাখ্যা করছে, যা সার্কুলার বা চক্রাকার যুক্তি হয়ে যায়। তাই শেষ পর্যন্ত এমন একটা সত্তা থাকতেই হবে, যে নিজেই আবশ্যিক। যার অস্তিত্বের উৎস নিজের মধ্যেই আছে, কোনো বাইরের ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী নয়।
এখানেই যুক্তিটা থেমে যায় না। ফেজার তাঁর বইয়ে একটা দুই-ধাপের পদ্ধতি অনুসরণ করেন — প্রথমে এমন একটা সত্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করা, তারপর দেখানো যে সেই সত্তার কী কী গুণ থাকতেই হবে। এই আবশ্যিক সত্তাকে একমাত্র হতে হবে। কারণ, যদি দুটো আবশ্যিক সত্তা থাকত, তাহলে তাদের মধ্যে পার্থক্য করার মতো অন্তত একটা বৈশিষ্ট্য থাকতে হতো, এবং সেই পার্থক্যটার একটা ব্যাখ্যা দরকার হতো, যা আবশ্যিক সত্তার সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক। একইভাবে এটাকে হতে হবে সরল বা অযৌগিক (simple)। অর্থাৎ এর মধ্যে আলাদা আলাদা অংশ থাকতে পারবে না, কারণ অংশ থাকলে প্রশ্ন আসে, এই অংশগুলো একসাথে জোড়া লাগল কেন, এবং সেই জোড়া লাগানোর জন্যও একটা বাইরের ব্যাখ্যা লাগবে। এটাকে হতে হবে অপরিবর্তনীয় ও চিরন্তন, কারণ পরিবর্তন মানেই আগে না থাকা একটা সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়া, যার জন্য বাইরের কারণ দরকার। এই সব গুণ মিলিয়ে যা দাঁড়ায়, তা ঐতিহ্যগতভাবে যাকে বলা হয় ঈশ্বর, রেশনালিস্ট দার্শনিকরা তার দিকেই পৌঁছান।
এখানে একটা মজার ঐতিহাসিক বাঁক আছে। লাইবনিজ এই যুক্তি দিয়ে একজন ব্যক্তিগত, সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু আরেক দার্শনিক স্পিনোজা (Baruch Spinoza), যিনিও পর্যাপ্ত কারণের নীতি মানতেন প্রবলভাবে, তিনি ভিন্ন পথে হেঁটে বলেছিলেন — এই আবশ্যিক সত্তাটাই হলো প্রকৃতি বা মহাবিশ্ব নিজে, কোনো আলাদা স্বর্গীয় ব্যক্তিত্ব নয়। এটা দেখায়, পর্যাপ্ত কারণের নীতি মানলেই যে সবাই একই উপসংহারে পৌঁছাবে, তা নয়। ফেজারের দ্বিতীয় ধাপের যুক্তিগুলো (একত্ব, সরলতা, ইত্যাদি) ঠিক এই ফাঁকটাই বন্ধ করার চেষ্টা করে, যাতে দেখানো যায় আবশ্যিক সত্তাটা ভৌত মহাবিশ্বের মতো যৌগিক, পরিবর্তনশীল কিছু হতে পারে না।
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিগুলোর দিকে, কারণ এই যুক্তি একেবারে বিনা প্রতিরোধে পার হয়ে যায়নি। সবচেয়ে প্রচলিত আপত্তিটা দিয়েছেন দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russell) এবং পরে ডেরেক পারফিট (Derek Parfit)। এটাকে বলা হয় "নিরেট সত্য" বা "ব্রুট ফ্যাক্ট" আপত্তি। তাঁদের বক্তব্য হলো, কোথাও না কোথাও ব্যাখ্যার চেইন থামতেই হয়, তাহলে কেন সেটা মহাবিশ্ব বা তার মৌলিক উপাদানগুলোতেই থেমে যাবে না? কেন আমাদের আরও এক ধাপ এগিয়ে ঈশ্বর পর্যন্ত যেতে হবে? মহাবিশ্ব হয়তো শুধু আছে, এটাই চূড়ান্ত সত্য, এর পেছনে আর কোনো ব্যাখ্যা খোঁজার দরকার নেই। ফেজারের জবাব হলো, এটা একরকম বেছে বেছে সন্দেহবাদিতা। আমরা কখনো একটা চায়ের কাপ বা একটা পাথরের ব্যাপারে বলি না যে "এটা এমনি এমনি আছে, কোনো কারণ নেই", তাহলে পুরো মহাবিশ্বের জন্য আমরা সেই ছাড়টা কেন দেব, শুধু এটা বড় বলে? তাছাড়া ফেজার আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, যদি আমরা মেনে নিই যে কিছু জিনিস একেবারে বিনা কারণে ঘটতে বা থাকতে পারে, তাহলে আমাদের নিজের যুক্তি-তর্ক করার ক্ষমতার উপরও প্রশ্ন ওঠে। কারণ তখন আমাদের সিদ্ধান্তগুলো প্রকৃতপক্ষে আমাদের যুক্তির সাথে সম্পর্কিত কিনা, তা নিশ্চিত থাকে না। সমালোচকরা পাল্টা বলেন, এটা অতিরঞ্জিত তুলনা — ছোট ছোট জিনিসের জন্য ব্যাখ্যা খোঁজা আর গোটা বাস্তবতার জন্য ব্যাখ্যা খোঁজা, এই দুটো একই মাপের প্রশ্ন নয়।
দ্বিতীয় আপত্তিটা এসেছে দার্শনিক পিটার ভ্যান ইনওয়াগেনের (Peter van Inwagen) কাছ থেকে, এবং এটা টেকনিক্যালি বেশ জটিল। তাঁর যুক্তি হলো, যদি পর্যাপ্ত কারণের নীতি সব ফ্যাক্টের উপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সব আপতিক ফ্যাক্ট মিলিয়ে একটা "মহা-সংযুক্ত ফ্যাক্ট" কল্পনা করুন। এই মহা-ফ্যাক্টেরও একটা ব্যাখ্যা লাগবে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা যদি আবশ্যিক কিছু হয়, তাহলে মনে হয় পুরো মহা-ফ্যাক্টটাই আসলে আবশ্যিক হয়ে যাচ্ছে, অর্থাৎ পৃথিবীতে যা ঘটেছে সবকিছুই অবশ্যম্ভাবী ছিল। এটাকে বলা হয় "মডাল ফেটালিজম" বা নিয়তিবাদ, যা আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা ও সত্যিকারের সম্ভাবনার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক মনে হয়। আর যদি ব্যাখ্যাটা আপতিক কিছু হয়, তাহলে সেটা তো মহা-ফ্যাক্টেরই অংশ, তাই এটা নিজেকে নিজে ব্যাখ্যা করছে। অর্থাৎ, আবারও চক্রাকার সমস্যা। দার্শনিক আলেক্সান্ডার প্রুস (Alexander Pruss) এই আপত্তির বিরুদ্ধে পুরো একটা বই লিখেছেন, যেখানে তিনি যুক্তি দেন যে "একটা সংযুক্ত ফ্যাক্টের ব্যাখ্যা থাকলে তার প্রতিটা অংশেরও আলাদা ব্যাখ্যা থাকতে হবে" — এই অনুমানটাই প্রশ্নসাপেক্ষ, এবং এটা বাতিল করলে সমস্যাটা এড়ানো সম্ভব।
তৃতীয় আপত্তিটা আসে পদার্থবিজ্ঞান থেকে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে কিছু ঘটনা, যেমন রেডিওঅ্যাকটিভ পরমাণুর ক্ষয় (decay), সম্পূর্ণ এলোমেলো বা সম্ভাবনাভিত্তিক মনে হয় — কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই একটা পরমাণু একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে ভেঙে যায়, আগে নয়, পরেও নয়। যদি প্রকৃতিতে সত্যিই এমন ঘটনা থাকে যার কোনো কারণ নেই, তাহলে পর্যাপ্ত কারণের নীতি অন্তত কিছু ক্ষেত্রে ভুল প্রমাণিত হয়। এর জবাবে কেউ কেউ বলেন, কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তা আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা মাত্র, বাস্তবতায় সত্যিকারের কারণহীনতা নয়। অর্থাৎ হয়তো একটা অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা আছে, আমরা এখনো সেটা জানি না। কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হবে, এটা একটা অমীমাংসিত বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন, দার্শনিক তর্কে সহজে মিটে যাওয়ার মতো নয়।
সবশেষে আরেকটা স্বাভাবিক প্রশ্ন থাকে — এমনকি যদি আমরা মেনেও নিই একটা আবশ্যিক সত্তা থাকতেই হবে, কেন সেটাকে ধর্মের ঈশ্বরের মতো একজন ব্যক্তিত্ব, জ্ঞানী, ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন সত্তা বলে ভাবতে হবে? কেন সেটা স্পিনোজার মতো নিরাকার প্রকৃতি নিজেই নয়, বা পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মগুলোই নয়? ফেজার ও তাঁর মতো দার্শনিকরা দ্বিতীয় ধাপের যুক্তি দিয়ে এটা খণ্ডাতে চান। তাঁদের মতে ভৌত মহাবিশ্ব বা তার নিয়মগুলো যৌগিক, পরিবর্তনশীল, সময়ের সাথে বাঁধা, তাই এগুলো নিজেই আবশ্যিক সত্তার শর্ত পূরণ করে না।


