
সময় ও সম্ভাব্যতার যুক্তি: অ্যাকুইনাসের তৃতীয় পথ
সময় ও সম্ভাব্যতার যুক্তি: যদি একসময় সত্যিই কিছুই না থাকত, তাহলে এখন কিছু আছে কীভাবে?
আপনার ঘরে তাকিয়ে দেখুন একবার – টেবিলের ওপর রাখা একটা মোমবাতি, জানালার পাশে একটা টবের গাছ, আর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব। এই তিনটা জিনিসের একটা মিল আছে যা হয়তো আমরা কখনো খেয়াল করি না – এগুলোর কোনোটাই চিরকাল ছিল না, আর কোনোটাই চিরকাল থাকবে না। মোমবাতিটা একদিন জ্বলে শেষ হয়ে যাবে, গাছটা একদিন শুকিয়ে মরে যাবে, আর আমরা নিজেরাও একদিন থাকব না। এমনকি এই মুহূর্তে যেটা পুরোপুরি বাস্তব, সজীব, স্পষ্ট মনে হচ্ছে, সেটাও এমন একটা জিনিস যেটা "নাও থাকতে পারত"। এখন একটু অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করি নিজেকে – যদি প্রতিটা জিনিসই এমন হয় যে সেটা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে, তাহলে কি এমন কোনো সময় আসা সম্ভব ছিল না যখন আক্ষরিক অর্থেই কিছুই ছিল না – কোনো মোমবাতি না, কোনো গাছ না, কোনো মানুষ না, কিছুই না? আর যদি সত্যিই এমন একটা সময় থেকে থাকে যখন কিছুই ছিল না, তাহলে এখন এত কিছু আছে কী করে? শূন্য থেকে তো নিজে থেকে কিছু আসতে পারে না। এই প্রশ্নটাই থমাস আকুইনাসের বিখ্যাত "পাঁচটি পথ"-এর তৃতীয় পথের মূল কথা – যাকে বলা হয় "সম্ভাব্যতা ও প্রয়োজনীয়তার যুক্তি" (Argument from Possibility and Necessity), বা আরেকটু সহজ নামে "সময় ও সম্ভাব্যতার যুক্তি" (Argument from Time and Contingency)। আগের দুটি পোস্টে আমরা দেখেছিলাম পরিবর্তনের যুক্তি আর নিমিত্ত কারণের যুক্তি, আজ দেখব এই দুটোর চেয়ে অনেকটাই আলাদা, আর হয়তো সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন তোলা একটা যুক্তি।
যুক্তিটা কোথা থেকে এলো
আকুইনাস তার "সুম্মা থিওলজিকা" গ্রন্থের প্রথম ভাগে (প্রশ্ন ২, অনুচ্ছেদ ৩) এই তৃতীয় পথটা হাজির করেন প্রকৃতির একটা সাধারণ পর্যবেক্ষণ দিয়ে – আমাদের চারপাশে এমন জিনিস দেখা যায় যেগুলো "জন্মায় আর ধ্বংস হয়" (generation and corruption) – গাছপালা, প্রাণী, আগুন, বরফ। এই জিনিসগুলোর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে – এগুলো "থাকতেও পারে, না থাকতেও পারে" (possibile esse et non esse), অর্থাৎ এদের অস্তিত্ব আবশ্যিক না, নিছক সম্ভাব্য। এই ধরনের অস্তিত্বকে দর্শনের ভাষায় বলে "সম্ভাব্য" বা "কনটিনজেন্ট" (contingent) অস্তিত্ব। এর বিপরীতে আছে "আবশ্যিক" বা "নেসেসারি" (necessary) অস্তিত্ব, যা থাকতে বাধ্য, যার না-থাকা অসম্ভব। আকুইনাসের প্রশ্ন হলো – যদি সবকিছুই স্রেফ সম্ভাব্য হয়, তাহলে গোটা বাস্তবতার পেছনে কি এমন কিছু থাকার দরকার নেই যেটা আবশ্যিকভাবেই আছে?
মূল ধারণা সহজ ভাষায়
চিন্তা করুন একটা জ্বলন্ত মোমবাতির কথা। মোমবাতিটা এখন জ্বলছে – কিন্তু এটা এমন না যে এটা জ্বলতেই হতো, বাধ্যতামূলকভাবে। এটা না জ্বললেও পারত, এমনকি না বানানো হলেও পারত। এক সময় এই মোমবাতিটা ছিল না (তৈরির আগে), আর একদিন এটা থাকবে না (পুড়ে শেষ হয়ে গেলে বা গলে গেলে)। এই যে "না-থাকা"টা মোমবাতির জন্য সম্ভব – এটাই একে "সম্ভাব্য অস্তিত্ব" বানায়। আকুইনাসের যুক্তিতে একটা সহজ নীতি কাজ করে – যে জিনিস না-থাকতে পারে, সেটা আসলে কোনো না কোনো সময়ে ছিলও না। মানুষের বেলাতেও একই কথা – আমরা প্রত্যেকেই জন্মের আগে ছিলাম না, আর মৃত্যুর পর থাকব না। এখন প্রশ্ন হলো, যদি মহাবিশ্বের সবকিছুই – প্রতিটা মানুষ, প্রতিটা গ্রহ, প্রতিটা পরমাণু – এভাবে নিছক সম্ভাব্য হয়, তাহলে অসীম সময় ধরে চিন্তা করলে কী দাঁড়ায়? যদি প্রতিটা জিনিসেরই না-থাকার সম্ভাবনা থাকে, আর সময় অসীম হয়, তাহলে যুক্তিসংগতভাবে এমন একটা মুহূর্ত থাকা উচিত ছিল যখন সেই সম্ভাবনাটা বাস্তবায়িত হয়েছে – অর্থাৎ যখন কিছুই ছিল না। আর একবার যদি সত্যিই এমন একটা "শূন্য মুহূর্ত" ঘটে যায়, তাহলে তার পর থেকে আর কখনো কিছু থাকার কথা না – কারণ যা নেই, তা নিজে থেকে অস্তিত্বে আসতে পারে না, তাকে অস্তিত্বে আনার জন্য আগে থেকে অস্তিত্বশীল কিছু লাগে। কিন্তু বাস্তবে তো এখন অনেক কিছুই আছে। তাহলে শুরুর অনুমানটাই ভুল – সবকিছু নিছক সম্ভাব্য হতে পারে না। কোথাও একটা এমন সত্তা থাকতেই হবে যা আবশ্যিকভাবে আছে, যার অস্তিত্ব কখনো ছিল না এমনটা হতেই পারে না।
যুক্তির কাঠামো
পুরো যুক্তিটা ধাপে ধাপে এভাবে সাজানো যায়:
১) প্রকৃতিতে আমরা এমন জিনিস দেখি যেগুলো সম্ভাব্য – অর্থাৎ যেগুলো থাকতেও পারে, না থাকতেও পারে (এরা জন্মায় আর ধ্বংস হয়)।
২) যে জিনিস না-থাকতে পারে, সেটা কোনো না কোনো সময়ে ছিলও না – এটা একটা যৌক্তিক অনিবার্যতা।
৩) যদি প্রতিটা জিনিসই এরকম সম্ভাব্য হয়, তাহলে (অসীম সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে) এমন একটা সময় থাকা উচিত ছিল যখন কিছুই ছিল না।
৪) কিন্তু যা নেই, তা নিজে থেকে অস্তিত্বে আসতে পারে না – অস্তিত্বে আসার জন্য আগে থেকেই অস্তিত্বশীল কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় (এটাকে ল্যাটিনে বলে "এক্স নিহিলো নিহিল ফিট" – শূন্য থেকে কিছু আসে না)।
৫) সুতরাং যদি একসময় সত্যিই কিছুই না থাকত, তাহলে এখনো কিছুই থাকত না – যা মিথ্যা, কারণ এখন স্পষ্টতই অনেক কিছু আছে।
৬) অতএব সবকিছু নিছক সম্ভাব্য, এই অনুমানটা মিথ্যা – এমন কিছু থাকতেই হবে যা আবশ্যিকভাবে আছে, যেটা অন্য কারো ওপর নির্ভর না করে নিজের ভেতরেই তার অস্তিত্বের ভিত্তি ধারণ করে।
৭) এই আবশ্যিক সত্তাটাকেই আকুইনাস বলেন ঈশ্বর।
একটা জরুরি পার্থক্য: কেন এই যুক্তি "সময়"-নির্ভর
আগের দুই পর্বে যে যুক্তিগুলো দেখেছি, সেগুলোর সাথে এই তৃতীয় পথের একটা সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। দ্বিতীয় পথ (নিমিত্ত কারণের যুক্তি) কথা বলে এই মুহূর্তে চলমান একটা নির্ভরতার সম্পর্ক নিয়ে – অতীতে কী ঘটেছিল সেটা নিয়ে না। কিন্তু তৃতীয় পথটা স্পষ্টভাবেই সময়ের ওপর নির্ভর করে – এখানে যুক্তিটা বলছে, যদি অসীম সময় ধরে প্রতিটা জিনিসের না-থাকার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে অতীতের কোনো এক মুহূর্তে সব সম্ভাবনাই বাস্তবায়িত হয়ে যাওয়ার কথা, অর্থাৎ একটা "শূন্য মুহূর্ত" থাকারই কথা। এই কারণেই এই যুক্তিটাকে "সময় ও সম্ভাব্যতার যুক্তি" নাম দেওয়া হয় – এখানে সময় (এবং সেই সময়ের সাথে সম্ভাবনার বাস্তবায়ন) যুক্তির কাঠামোর একটা অপরিহার্য অংশ। পরবর্তীকালের দার্শনিকরা – যেমন গটফ্রিড লাইবনিজ (Gottfried Leibniz) – এই একই মূল ধারণাটা নিয়ে একটা আলাদা সংস্করণ বানান, যেখানে সময়ের ওপর নির্ভরতা বাদ দিয়ে শুধু যুক্তির (মোডাল লজিকের) মাধ্যমে বলা হয় – মহাবিশ্ব চিরকাল ধরে থেকে থাকলেও তার অস্তিত্বের একটা পর্যাপ্ত কারণ লাগবে, কারণ চিরস্থায়ী হওয়া মানেই আবশ্যিক হওয়া না। আকুইনাসের মূল সংস্করণ আর লাইবনিজের পরবর্তী সংস্করণ – দুটোই "সম্ভাব্যতা থেকে আবশ্যিকতার দিকে" যাওয়ার একই মৌলিক পথ ধরে, কিন্তু আকুইনাসেরটা সময়নির্ভর, লাইবনিজেরটা যুক্তিনির্ভর।
সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থন কী
এই যুক্তির আবেদনটা এখানেই যে এটা এমন একটা প্রশ্ন তোলে যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন – "কেন আদৌ কিছু আছে, কিছুই না থাকার বদলে?" (why is there something rather than nothing) – দর্শনের ইতিহাসে এটাকে অনেকেই সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন বলে মনে করেন। আমরা নিজেরাও জানি, আমাদের অস্তিত্ব আবশ্যিক না – আমরা না থাকলেও পারতাম, আমাদের বাবা-মা যদি কখনো দেখা না করতেন, আমরা জন্মাতামই না। এই সাধারণ উপলব্ধিটাকেই আকুইনাস যুক্তিসংগতভাবে পুরো মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন – যদি প্রতিটা অংশই সম্ভাব্য হয়, পুরো সংগ্রহটাও কি সম্ভাব্য না? আর যদি তাই হয়, তাহলে কোথাও একটা এমন ভিত্তি না থাকলে পুরো ব্যবস্থাটাই "ঝুলে" থাকে, কোনো প্রকৃত ব্যাখ্যা ছাড়া।
এবার আসি সমালোচনার দিকে
প্রথম আর সবচেয়ে প্রভাবশালী আপত্তিটা আসে ব্রিটিশ দার্শনিক অ্যান্টনি কেনির (Anthony Kenny) কাছ থেকে, যিনি নিজে একসময় ক্যাথলিক পুরোহিত ছিলেন এবং আকুইনাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ পণ্ডিত। কেনি বলেন, আকুইনাসের তৃতীয় পথের তৃতীয় ধাপে (প্রতিটা জিনিস কোনো না কোনো সময়ে ছিল না থেকে, এমন একটা সময় ছিল যখন কিছুই ছিল না – এই লাফে) একটা যৌক্তিক ভুল আছে, যাকে বলে "কোয়ান্টিফায়ার শিফট ফ্যালাসি" (quantifier shift fallacy)। এটা বোঝার জন্য একটা সহজ উদাহরণ নিন – এটা সত্যি যে "প্রতিটা মানুষেরই একজন মা আছে", কিন্তু এখান থেকে এটা বলা ভুল হবে যে "এমন একজন মহিলা আছেন যিনি প্রত্যেক মানুষেরই মা"। প্রতি আর কোনো-একটা – এই দুটো ভিন্ন জিনিস, আর একটা থেকে আরেকটায় লাফ দিলে যুক্তিতে গলদ থেকে যায়। একইভাবে, "প্রতিটা জিনিসই কোনো না কোনো সময়ে ছিল না" – এটা সত্যি হতে পারে, অথচ এখান থেকে এটা বলা ভুল হবে যে "এমন একটা নির্দিষ্ট সময় আছে যখন সব জিনিসই একসাথে ছিল না"। হতে পারে প্রতিটা জিনিসই আলাদা আলাদা সময়ে ছিল না, কিন্তু সবসময়ই অন্তত একটা কিছু না কিছু ছিল – ঠিক যেমন একটা ক্লাসের প্রতিটা ছাত্রই আলাদা আলাদা দিনে জন্মেছে, কিন্তু তার মানে এই না যে এমন একটা দিন ছিল যেদিন ক্লাসের কোনো ছাত্রই এখনো জন্মায়নি। আকুইনাসের রক্ষাকারীরা – যেমন আধুনিক থোমিস্ট দার্শনিক এডওয়ার্ড ফেজার (Edward Feser) – এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের যুক্তি হলো, আকুইনাস আসলে সরল ঐতিহাসিক সময়ের কথা বলছেন না, বরং দ্বিতীয় পথের মতোই একটা "এই মুহূর্তে নির্ভরতার" কাঠামোর কথা বলছেন – প্রশ্নটা কোনো এক অতীত মুহূর্তে সবকিছু একসাথে না-থাকা নিয়ে না, বরং এই প্রশ্ন নিয়ে যে সম্ভাব্য জিনিসের একটা সংগ্রহ, নিজে থেকেই, নিজের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দিতে পারে কি না। এই ব্যাখ্যা কেনির আপত্তিকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে কি না, তা নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে এখনো বিতর্ক চলছে।
দ্বিতীয় আপত্তিটা হলো – মহাবিশ্ব নিজেই কি আবশ্যিক সত্তা হতে পারে না? যদি মহাবিশ্ব বা পদার্থ চিরকাল ধরে থেকে থাকে (শুরু বা শেষ ছাড়া), তাহলে আলাদা করে কোনো ঈশ্বরের দরকার কী? এর জবাবে দার্শনিক আলেকজান্ডার প্রুস (Alexander Pruss)-এর মতো থোমিস্ট চিন্তাবিদরা বলেন, চিরস্থায়ী হওয়া আর আবশ্যিক হওয়া এক জিনিস না – মহাবিশ্ব যদি অসংখ্য সম্ভাব্য অংশ (পরমাণু, কণা) দিয়ে গঠিত হয়, তাহলে পুরো সংগ্রহটাও সম্ভাব্যই থেকে যায়, শুধু অংশগুলো যোগ করলেই সেটা আবশ্যিক হয়ে যায় না। একগুচ্ছ সম্ভাব্য জিনিস মিলে কখনো নিজে থেকে আবশ্যিকতা তৈরি করতে পারে না – এটা অনেকটা এমন, যেন অনেকগুলো ঋণ যোগ করলে হঠাৎ সম্পদ তৈরি হয়ে যায়, যা যুক্তিসংগতভাবে অসম্ভব।
তৃতীয় আপত্তিটা আসে সেই পুরনো "মৌলিক সত্য" (brute fact) তর্ক থেকে, যা বার্ট্রান্ড রাসেল আর ডেভিড হিউম উভয়েই আলাদাভাবে তুলেছিলেন – কেন ধরে নিতে হবে যে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের একটা "ব্যাখ্যা" থাকতেই হবে? হয়তো মহাবিশ্ব, বা তার ভেতরের কোনো মৌলিক অবস্থা, এমনিই আছে, কোনো আরও গভীর কারণ ছাড়াই। এই আপত্তি আসলে "পর্যাপ্ত কারণের নীতি" (Principle of Sufficient Reason)-টাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে, যার ওপর পুরো যুক্তিটা দাঁড়িয়ে আছে। আকুইনাসের সমর্থকরা বলেন, এই নীতি ছাড়া বিজ্ঞান নিজেও দাঁড়াতে পারে না – প্রতিটা ঘটনার একটা কারণ খোঁজাই তো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি; তাই মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে হঠাৎ এই নীতি ছেড়ে দেওয়াটা যুক্তিসংগত মনে হয় না।
চতুর্থ আপত্তিটা আগের পর্বগুলোর মতোই "অনন্যতার সমস্যা" – এমনকি যদি মেনেও নিই একটা আবশ্যিক সত্তা থাকতে হবে, যুক্তিটা নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে এই সত্তা একটাই, বা তার বুদ্ধি-ইচ্ছা-ব্যক্তিত্ব আছে, বা এটাই সেই ঈশ্বর যাকে বিভিন্ন ধর্মে পূজা করা হয়। আকুইনাস নিজেও এই ফাঁক বুঝতেন – সুম্মা থিওলজিকার পরের প্রশ্নগুলোতে তিনি আলাদাভাবে যুক্তি দেন কেন এই আবশ্যিক সত্তা একটাই হতে হবে এবং কেন তার মধ্যে জ্ঞান-ইচ্ছার মতো গুণ থাকতে হবে। সমালোচকরা মনে করেন এই বাড়তি ধাপগুলো মূল পাঁচটা পথের চেয়ে অনেক বেশি অনুমাননির্ভর।
শেষ কথা
আকুইনাসের এই তৃতীয় পথ আমাদের এমন একটা জায়গায় দাঁড় করায় যেখানে যুক্তি আর বিস্ময় একসাথে মিশে যায় – আমাদের চারপাশের প্রতিটা জিনিসই, এমনকি আমরা নিজেরাও, এমন যে থাকতেও পারতাম না, না থাকাটাও সমান সম্ভব ছিল। তাহলে এত কিছুর অস্তিত্ব কি নিছক একটা দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে সত্যিই এমন কিছু থাকা দরকার যা কখনো না-থাকতে পারে না? এই প্রশ্নটা দর্শনের সবচেয়ে পুরনো প্রশ্নগুলোর একটা, অথচ এখনো এর উত্তর নিয়ে যুক্তিবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী আর ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে বিতর্ক থামেনি।
ভাল ভাবে লক্ষ্য করলে দেখবেন কোরআন বুঝে অধ্যয়নকালী একজন চিন্তাশীল মুসলিমের ভাবনার সাথে এই দার্শনিক যুক্তিগুলো দারুণভাবে মিলে যায়। কোরআনের মধ্যে দার্শনিকদের কাছে আপাত অমিমাংসিত কিছু প্রশ্নের উত্তর খুব পরিস্কার ভাবে পাওয়া যায়। যেমন, দার্শনিক ভাবনার মাধ্যমে প্রাপ্ত আবশ্যকীয় সত্ত্বার বৈশিষ্ট্যগুলো সুরা ইখলাসে বর্ণিত স্রষ্টার গুনাবলীরই যেন প্রতিফলন। এর থেকে বোঝা যায়, যে এককভাবে দর্শনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে, ধর্মীয় গ্রন্থ, ইতিহাস, অভিজ্ঞতা এবং বিজ্ঞানের সমন্বয় করলে স্রষ্টার অস্থিত্ব সম্পর্কে কনভিকশন পূর্ণতা পায়।


