
পরিবর্তনের যুক্তি: অ্যাকুইনাসের প্রথম পথ
পরিবর্তনের যুক্তি: এক কাপ চা ঠান্ডা হওয়া থেকে আকুয়াইনাসের প্রথম পথ পর্যন্ত
আপনার সামনে রাখা এক কাপ গরম চা একটু পরেই ঠান্ডা হয়ে যায়। বরফ গলে পানি হয়ে যায়। একটা শিশু বড় হয়ে যুবক হয়, তারপর বৃদ্ধ। আশেপাশে তাকালে দেখবেন, প্রতিটা মুহূর্তে কিছু না কিছু বদলাচ্ছে – কোনো কিছুই একই অবস্থায় স্থির থাকছে না। এই এত সাধারণ, এত রোজকার একটা ঘটনা – "পরিবর্তন" – এটা নিয়ে কখনো গভীরভাবে ভেবেছেন? জিনিসটা কি নিজে নিজেই বদলায়, নাকি প্রতিটা পরিবর্তনের পেছনে কিছু একটা কাজ করে? প্রায় আটশো বছর আগে খ্রিস্টান দার্শনিক-ধর্মতাত্ত্বিক থমাস আকুয়াইনাস (Thomas Aquinas) এই সহজ প্রশ্ন থেকেই শুরু করেছিলেন এমন একটা যুক্তি, যেটা তার বিখ্যাত "পাঁচটি পথ" (Five Ways)-এর প্রথমটা, আর আজও দর্শনের জগতে সমান প্রাসঙ্গিক। চলুন আজ সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি যুক্তিটা আসলে কী বলে, আর কোথায় এটা নিয়ে বিতর্ক আছে।
যুক্তিটা কোথা থেকে এলো
থমাস আকুয়াইনাস ছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর একজন ইতালীয় সন্ন্যাসী আর দার্শনিক, যিনি তার বিশাল গ্রন্থ "সুম্মা থিওলজিকা" (Summa Theologica)-তে ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে পাঁচটি যুক্তি হাজির করেন – এগুলোকেই বলা হয় "পাঁচটি পথ"। প্রথম পথটা শুরু হয় "পরিবর্তন" (change বা motion) দিয়ে – আকুয়াইনাস নিজে বলেছিলেন, এটাই সবচেয়ে স্পষ্ট আর সহজবোধ্য পথ, কারণ পরিবর্তন আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত ঘটছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই যুক্তির শিকড় অবশ্য আরও পুরনো – প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তার "ফিজিক্স" আর "মেটাফিজিক্স" গ্রন্থে "অপরিবর্তনীয় পরিবর্তক" (Unmoved Mover) নামে একটা ধারণা হাজির করেছিলেন। আকুয়াইনাস অ্যারিস্টটলের এই কাঠামোটা নিয়ে সেটাকে একটা ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করান।
মূল ধারণা: সম্ভাবনা আর বাস্তবতা
এই যুক্তিটা বুঝতে হলে প্রথমে দুইটা শব্দ বুঝতে হবে, যেগুলো অ্যারিস্টটল আর আকুয়াইনাস দুজনেই ব্যবহার করেছেন – "সম্ভাবনা" (potentiality) আর "বাস্তবতা" বা "কার্যকারিতা" (actuality)। ব্যাপারটা আসলে খুব জটিল না। ধরুন আপনার সামনে এক কাপ ঠান্ডা চা আছে। এই চায়ের মধ্যে "গরম হওয়ার সম্ভাবনা" আছে – অর্থাৎ এটা গরম হতে পারে, এমন প্রবণতা তার মধ্যে লুকিয়ে আছে। কিন্তু চা নিজে থেকে গরম "হয়ে যায় না" – এটা গরম হওয়ার জন্য দরকার আগুন বা চুলা, যেটা ইতিমধ্যে "বাস্তবে গরম" (actually hot)। একইভাবে, একটা কাঠের গুঁড়ির মধ্যে "আগুন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা" আছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দরকার হয় এমন কিছু, যেটা ইতিমধ্যে বাস্তবে জ্বলছে – যেমন একটা দেশলাইয়ের আগুন। আকুয়াইনাসের মূল দাবিটা হলো – কোনো কিছু নিজের সম্ভাবনাকে নিজে নিজে বাস্তবে পরিণত করতে পারে না। চা নিজেকে নিজে গরম করতে পারে না; কাঠ নিজেকে নিজে জ্বালাতে পারে না। যা "সম্ভাবনায়" আছে, তাকে বাস্তবে আনতে হলে এমন কিছু লাগবে যেটা ইতিমধ্যে "বাস্তবে" সেই গুণটা ধারণ করে আছে।
যুক্তির কাঠামো
এই ধারণা থেকেই যুক্তিটা দাঁড় করানো যায়, মোটামুটি এভাবে:
১) আমরা চোখের সামনে দেখি, জগতে জিনিস পরিবর্তিত হচ্ছে (অর্থাৎ সম্ভাবনা থেকে বাস্তবতায় রূপান্তরিত হচ্ছে)।
২) যা কিছু পরিবর্তিত হয়, তা নিজে নিজে পরিবর্তিত হতে পারে না – তাকে অন্য কিছু দিয়ে পরিবর্তিত করতে হয়, যা ইতিমধ্যে বাস্তবে সেই গুণ ধারণ করে।
৩) এই "পরিবর্তনকারী"ও যদি নিজে পরিবর্তনশীল হয়, তাহলে তাকেও আবার অন্য কিছু পরিবর্তিত করছে – আর এভাবে একটা শৃঙ্খল তৈরি হয়।
৪) এই শৃঙ্খল অসীম পর্যন্ত পেছাতে পারে না, কারণ তাহলে শুরুতেই কোনো প্রকৃত কার্যকারিতা (actuality) থাকবে না, যা থেকে বাকি সব শক্তি পাবে।
৫) সুতরাং শেষ পর্যন্ত এমন একটা সত্তা থাকতে হবে, যে নিজে পরিবর্তিত হয় না, কিন্তু বাকি সবকিছুকে পরিবর্তিত করে – এটাই "অপরিবর্তনীয় পরিবর্তক" (Unmoved Mover), যাকে আকুয়াইনাস চিহ্নিত করেন ঈশ্বর হিসেবে।
হাত, লাঠি আর পাথর – একটা জরুরি পার্থক্য
এখানে একটা জিনিস স্পষ্ট করে বোঝা দরকার, কারণ এটা প্রায়ই ভুল বোঝা হয়। আকুয়াইনাস যে "অসীম শৃঙ্খল সম্ভব না" বলছেন, সেটা কোনো সময়ের হিসেবে অতীতের দিকে পেছানো শৃঙ্খল না (যেমনটা "কালাম" যুক্তিতে ছিল, যেখানে প্রশ্ন ছিল মহাবিশ্বের সময়ের শুরু আছে কিনা)। এখানে প্রশ্নটা ভিন্ন – এটা একই মুহূর্তে, এখনই ঘটে চলা একটা নির্ভরতার শৃঙ্খল নিয়ে। আকুয়াইনাস নিজে একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন – একটা হাত একটা লাঠি দিয়ে একটা পাথরকে নাড়াচ্ছে। এখানে পাথরটা নড়ছে লাঠির কারণে, লাঠিটা নড়ছে হাতের কারণে – কিন্তু লাঠির নিজের মধ্যে নড়ানোর কোনো ক্ষমতা নেই, সে শুধু হাত থেকে ধার করা শক্তি দিয়ে পাথরটা নাড়াচ্ছে। যদি হাতটা থেমে যায়, লাঠিও থেমে যাবে, পাথরও থেমে যাবে – সব একসাথে, এখনই। এই তিনটা জিনিস একই সময়ে ঘটছে, একটা আরেকটার ওপর নির্ভরশীল। এটাকে বলা হয় "essentially ordered" শৃঙ্খল। এর বিপরীতে আছে "accidentally ordered" শৃঙ্খল – যেমন একজন ব্যক্তি একটা সন্তানের জন্ম দেন, সেই সন্তান বড় হয়ে আরেকটা সন্তানের জন্ম দেন – এখানে প্রথম ব্যক্তি মারা গেলেও দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্তান জন্ম নিতে কোনো বাধা নেই, কারণ প্রতিটা প্রজন্ম নিজের মধ্যেই জন্ম দেওয়ার সম্পূর্ণ ক্ষমতা ধারণ করে। কালাম যুক্তি কথা বলে দ্বিতীয় ধরনের শৃঙ্খল নিয়ে – অতীতের দিকে সময় ধরে পেছানো একটা লাইন। আর আকুয়াইনাসের এই যুক্তি কথা বলে প্রথম ধরনের শৃঙ্খল নিয়ে – এখন, এই মুহূর্তে, একটা জিনিস আরেকটার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকার আর কাজ করার শক্তি পাচ্ছে কিনা। আকুয়াইনাসের মতে, এই ধরনের নির্ভরতার শৃঙ্খল অসীম হতে পারে না, কারণ যদি প্রতিটা সদস্যই শুধু ধার করা শক্তি নিয়ে চলে, তাহলে কোথাও না কোথাও এমন একটা উৎস থাকতে হবে যে নিজে থেকেই শক্তিশালী, ধার করা না।
সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থন কী
এই যুক্তির আকর্ষণ হলো এটা শুরু হয় এমন একটা পর্যবেক্ষণ থেকে যা কেউ অস্বীকার করতে পারে না – পরিবর্তন সত্যিই ঘটে, এটা নিয়ে কোনো তর্ক নেই। আর "কোনো কিছু নিজেকে নিজে দিতে পারে না যা তার নেই" – এই স্বজ্ঞাটাও (intuition) বেশ শক্তিশালী। একটা খালি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে আপনি নিজে নিজে টাকা বের করতে পারবেন না; কাউকে না কাউকে সেখানে টাকা জমা দিতে হবে। একইভাবে, যার নিজের মধ্যে কোনো গুণ "বাস্তবে" নেই, সে সেই গুণ অন্য কাউকে দিতে পারে না। এই সাধারণ যুক্তিসংগত নীতিটাকে বিজ্ঞান আর দর্শন দুই জায়গাতেই মেনে চলা হয় – কার্যকারণ সম্পর্ক (causation) নিয়ে আমাদের প্রতিদিনের চিন্তাভাবনার ভিত্তিই এটা।
এবার আসি সমালোচনার দিকে
প্রথম আর সবচেয়ে পরিচিত আপত্তিটা আসে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে। নিউটনের জড়তার সূত্র (law of inertia) বলে, গতিশীল কোনো বস্তু বাইরের কোনো বল ছাড়াই সমবেগে চলতে থাকতে পারে – তাকে চলতে থাকার জন্য কোনো "ক্রমাগত পরিবর্তনকারী"র দরকার নেই। তাহলে কি আকুয়াইনাসের প্রথম প্রস্তাবনা – "যা নড়ে, তা অন্য কিছুর দ্বারা নড়ে" – ভুল প্রমাণিত হয় না? আকুয়াইনাসের সমর্থকরা জবাবে বলেন, আকুয়াইনাস শুধু স্থান পরিবর্তনের (locomotion) কথা বলছেন না, বরং তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত অর্থে "পরিবর্তন" বলতে বোঝাচ্ছেন – সম্ভাবনা থেকে বাস্তবতায় যেকোনো রূপান্তর, যেমন তাপমাত্রা বদলানো, রং বদলানো, অস্তিত্বে আসা। সমান বেগে সরল রেখায় চলা একটা বস্তুর ক্ষেত্রে বলা যায় এটা আসলে একটা "অবস্থা" (state), পরিবর্তন নয় – তাই জড়তার সূত্র এই যুক্তির মূল দাবিটাকে সরাসরি খণ্ডন করে না বলে তারা মনে করেন। সমালোচকরা অবশ্য এই জবাবেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন, আর এই বিতর্ক এখনও চলমান।
দ্বিতীয় আপত্তিটা তোলেন সমসাময়িক দার্শনিক গ্রাহাম অপি (Graham Oppy)-এর মতো চিন্তাবিদরা – "অনন্যতার সমস্যা" (uniqueness problem)। তাদের প্রশ্ন – ধরে নিলাম শৃঙ্খলের শেষে একটা "অপরিবর্তনীয় উৎস" থাকতে হবে, কিন্তু যুক্তির কোনো অংশে তো বলা হয়নি এই উৎস একটাই, বা এটাই সবার জন্য একই সত্তা। একাধিক আলাদা আলাদা "প্রথম কারণ" থাকলেও তো যুক্তিটা মেনে নেওয়া যায় – তাহলে এখান থেকে একেশ্বরবাদী ঈশ্বরের ধারণায় পৌঁছানো কীভাবে যৌক্তিক হয়?
তৃতীয় আপত্তিটা আরও বিস্তৃত – একে বলা যায় "বহু-লাফের সমস্যা" (many non-sequiturs)। সমালোচকরা বলেন, ধরে নিলাম একটা "প্রথম পরিবর্তক" প্রমাণিত হলো – কিন্তু সেখান থেকে এই সত্তার বুদ্ধিমত্তা, ইচ্ছাশক্তি, মঙ্গলময়তা, বা ব্যক্তিত্ব আছে – এইসব বৈশিষ্ট্যে পৌঁছানো একেবারে আলাদা একটা কাজ, যেটা মূল যুক্তির তিন-চারটা লাইনে হয় না। আকুয়াইনাস নিজে অবশ্য সুম্মা থিওলজিকা-র পরবর্তী অংশে আলাদাভাবে এই বৈশিষ্ট্যগুলো প্রমাণের চেষ্টা করেছেন – তার মতে পাঁচটি পথ শুধু শুরুর ধাপ, পুরো যুক্তি না। এডওয়ার্ড ফেজার (Edward Feser)-এর মতো আধুনিক থোমিস্ট দার্শনিকরা জোর দিয়ে বলেন, পাঁচটি পথকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করা ভুল – এগুলো আসলে একটা অনেক বড় দার্শনিক কাঠামোর অংশ মাত্র।
চতুর্থ আপত্তি আসে "অসীম শৃঙ্খল আসলেই কেন অসম্ভব" – এই প্রশ্ন থেকে। অনেক সমালোচক বলেন, গাণিতিকভাবে অসীম সেট নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, তাহলে বাস্তবেও একটা অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল থাকতে বাধা কোথায়? ফেজারের মতো সমর্থকরা জবাবে বলেন, এই শৃঙ্খলটা তো নিছক গণনার প্রশ্ন না – এটা এই মুহূর্তে প্রতিটা সদস্য আরেকজনের কাছ থেকে শক্তি ধার করছে কিনা, সেই প্রশ্ন। যদি প্রতিটা সদস্যই শুধু ধারকৃত শক্তি নিয়ে চলে, আর নিজস্ব কোনো শক্তির উৎস না থাকে, তাহলে পুরো শৃঙ্খলটাতেই আসলে কোনো প্রকৃত শক্তি নেই – সংখ্যাটা অসীম হোক বা সসীম, তাতে কিছু আসে যায় না। এই তর্কও এখনও দর্শনের বৃত্তে জীবন্ত।
শেষ কথা
আকুয়াইনাসের পরিবর্তনের যুক্তি আমাদের চারপাশের সবচেয়ে সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে শুরু হয়ে সবচেয়ে গভীর প্রশ্নে গিয়ে পৌঁছায় – জগতে যা কিছু বদলাচ্ছে, তার পেছনে কি সত্যিই এমন কিছু থাকতে হবে যে নিজে অপরিবর্তনীয়? নাকি পরিবর্তনের শৃঙ্খলটা এমনিতেই, কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই চলতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ না, আর আটশো বছর ধরে দার্শনিকরা এটা নিয়ে তর্ক করে চলেছেন, তবুও কোনো একক উত্তরে পৌঁছাননি। হয়তো এটাই এই ধরনের প্রশ্নের সৌন্দর্য – এগুলো আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেয় না।
তবে শুধু একটি যুক্তিতে নির্ভর না করে, আমরা যদি সম্মিলিত ভাবে অনেকগুলো দার্শনিক যুক্তি নিয়ে চিন্তা করি, সাথে রিলিজিয়াস টেক্সগুলোকে গাইড হিসেবে ব্যবহার করি, তা আমাদের চূড়ান্তের সত্যের কাছাকাছি পৌছাতে সাহায্য করতে পারে।


