
নব্য-প্লেটোনিক প্রমাণ (এডওয়ার্ড ফেজার)
নিও-প্ল্যাটোনিক প্রুফ
আপনার হাতের ফোনটার দিকে একবার তাকান। স্ক্রিন, ব্যাটারি, চিপ, প্লাস্টিকের বডি — অনেকগুলো আলাদা আলাদা অংশ একসাথে জোড়া লেগে একটা "ফোন" হয়ে আছে। এবার নিজের শরীরের দিকে তাকান। কোটি কোটি কোষ, রক্ত, হাড়, স্নায়ু — সব মিলে "আপনি" হয়ে আছেন। এমনকি এই মুহূর্তে আপনি যে চেয়ারে বসে আছেন, সেটাও কাঠ, স্ক্রু, আঠা দিয়ে তৈরি।
একটা প্রশ্ন করি। এই জিনিসগুলো তৈরি হয়েছে অতীতে — কারখানায়, মায়ের গর্ভে, কাঠমিস্ত্রির হাতে। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, কেন এই অংশগুলো একসাথে লেগে আছে? কেন ফোনের স্ক্রিন হঠাৎ আলাদা হয়ে যাচ্ছে না, কেন আপনার শরীরের কোষগুলো এই মুহূর্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে না? "অতীতে তৈরি হয়েছিল" — এই উত্তরটা কি আসলে যথেষ্ট?
এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে দর্শনের এক অসাধারণ পুরনো যুক্তি, যাকে বলা হয় "নব্য-প্লেটোনিক প্রমাণ" (Neo-Platonic Proof)। এর শিকড় প্রাচীন গ্রিক-রোমান দার্শনিক প্লোটিনাসের (Plotinus, খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দী) চিন্তায়, আর আধুনিক কালে এটাকে খুব পরিষ্কারভাবে সাজিয়েছেন আমেরিকান দার্শনিক এডওয়ার্ড ফেজার (Edward Feser) তাঁর "Five Proofs of the Existence of God" বইয়ে। চলুন, একদম সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি — যুক্তিটা কী বলছে, কেন অনেকে এটাকে শক্তিশালী মনে করেন, আর কেন অনেক দার্শনিক এতে গুরুতর আপত্তি তোলেন।
তাসের ঘর দিয়ে বোঝা যাক
কল্পনা করুন, আপনি তাস দিয়ে একটা ঘর বানাচ্ছেন। নিচের সারির দুটো তাস একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ওপর আরেকটা তাস শুয়ে আছে। তার ওপর আবার আরেক সারি হেলানো তাস। পুরো কাঠামোটা টিকে আছে কারণ প্রতিটা তাস তার নিচের তাসের ওপর নির্ভর করছে — ঠিক এই মুহূর্তে, একসাথে, একই সময়ে। এটা কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নয় (যেমন "গতকাল আমি এই তাসটা রেখেছিলাম") — এটা এখনকার, বর্তমান মুহূর্তের নির্ভরতা।
এখন প্রশ্ন হলো: পুরো তাসের ঘরটা কীসের ওপর দাঁড়িয়ে? উত্তর হলো টেবিল। টেবিলটা তাসের মতো আরেকটা তাসের ওপর হেলান দিয়ে নেই — সেটা নিজেই শক্ত, নিজে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তার আর কোনো "নিচের তাস"-এর দরকার নেই।
নব্য-প্লেটোনিক যুক্তির মূল কথাটা অনেকটা এরকম। আমাদের চারপাশের প্রতিটা জিনিস — ফোন, শরীর, চেয়ার, এমনকি একটা পরমাণু পর্যন্ত — "যৌগিক" বা কম্পোজিট (composite), মানে অনেকগুলো অংশ দিয়ে তৈরি। কিন্তু শুধু অংশগুলো একসাথে জড়ো করে দিলেই তো "একটা জিনিস" তৈরি হয় না। কাঠ, স্ক্রু, আর আঠা আলাদা আলাদা টেবিলের ওপর পড়ে থাকলে সেটা "চেয়ার" নয়, স্তূপ মাত্র। কিছু একটা এই অংশগুলোকে এই মুহূর্তে, এখন, একসাথে ধরে রাখছে বলেই এটা একটা "চেয়ার" হিসেবে টিকে আছে।
ফেজারের যুক্তি বলছে, এই "ধরে রাখা"-টা একটা কারণ (cause) দাবি করে — এবং সেই কারণ যদি নিজেও যৌগিক হয় (নিজেও অনেক অংশ দিয়ে তৈরি হয়), তাহলে তারও নিজের অংশগুলোকে ধরে রাখার জন্য আরেকটা কারণ লাগবে। এভাবে একটার পর একটা স্তর — ঠিক তাসের ঘরের মতো, অতীতের দিকে নয়, বরং বর্তমানের গভীরে — নেমে যেতে থাকে। প্রশ্ন হলো: এই স্তরগুলো কি অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকতে পারে, নিচে কোনো "টেবিল" ছাড়াই?
ক্লাসিক্যাল দার্শনিকরা বলেন, না। যদি নিচে কোনো প্রকৃত ভিত্তি না থাকে — যদি পুরো ব্যবস্থাটা শুধু তাসের-ওপর-তাস হয়েই চলতে থাকে, কোনো টেবিল ছাড়াই — তাহলে আসলে কোনো কিছুই কিছুকে ধরে রাখছে না। পুরো কাঠামোটা তখন শূন্যে ভাসমান, আর বাস্তবে এরকম কিছু ধরে রাখাই সম্ভব নয়। তাই এই স্তরগুলোর শেষে এমন একটা কিছু থাকতেই হবে যেটা নিজে যৌগিক নয় — যার কোনো অংশ নেই, তাই যাকে ধরে রাখার জন্য আর কোনো আলাদা কারণের দরকার নেই। এই "অংশহীন", সম্পূর্ণ সরল বা অখণ্ড সত্তাকেই প্লোটিনাস বলতেন "দ্য ওয়ান" (The One), আর ফেজারসহ খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলিম ঐতিহ্যের অনেক দার্শনিক-ধর্মতাত্ত্বিক এটাকেই বলেন ঈশ্বর।
"সম্পূর্ণ সরল" মানে আসলে কী?
এখানে একটা জিনিস স্বীকার করা জরুরি — আমাদের অভিজ্ঞতায় এমন কিছুই নেই যা সত্যিকার অর্থে "সম্পূর্ণ সরল" বা অংশহীন। এমনকি একটা আলোর কণা বা একটা চিন্তাও কোনো না কোনোভাবে গঠিত। তাই এই যুক্তির শেষ ধাপে আমরা এমন একটা ধারণার মুখোমুখি হই যার সাথে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সরাসরি তুলনা চলে না। ঐতিহ্য বলে, এই সত্তায় "অস্তিত্ব" আর "সত্তা" আলাদা কিছু নয়, "শক্তি" আর "জ্ঞান" আলাদা টুকরো নয় — সবকিছু একই অখণ্ড বাস্তবতা। এজন্যই বলা হয়, ঈশ্বরের "ভালোত্ব আছে" তা নয়, বরং ঈশ্বর নিজেই ভালোত্ব। এটা আমাদের মতো একটা প্রাণীর বাড়তি ভালো সংস্করণ নয় — এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বাস্তবতা, যার ওপর নির্ভর করেই বাকি সব যৌগিক জিনিস এই মুহূর্তে টিকে থাকতে পারে।
এবার শুনি সমালোচকরা কী বলেন
এই যুক্তিটা যতটা সুন্দর শোনায়, ততটাই এটা কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়ে। সমসাময়িক দার্শনিক জোসেফ শ্মিড (Joseph Schmid) তাঁর "Simply Unsuccessful: The Neo-Platonic Proof of God's Existence" প্রবন্ধে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি তুলেছেন, যেগুলো ফেজারের সমর্থকদের কাছেও গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়।
প্রথম আপত্তি হলো, যুক্তির মূল ভিত্তি নিয়ে — "প্রতিটা যৌগিক জিনিসের অংশগুলোকে একসাথে ধরে রাখার জন্য অবশ্যই একটা সক্রিয় কারণ থাকতে হবে" — এই দাবিটা আসলে প্রমাণিত নয়। হয়তো একটা জিনিসের অংশগুলো একসাথে থাকার কারণ শুধুই সাধারণ পদার্থবিজ্ঞান — রাসায়নিক বন্ধন, মহাকর্ষ, বৈদ্যুতিক বল। এর জন্য আলাদা কোনো অতিপ্রাকৃত "ধরে-রাখা-কারণ" লাগার কথা নয়, এটা এমনকিছু দার্শনিকও মনে করেন যারা বিশ্বাস করেন "সমগ্র" (whole) বলে আলাদা কিছুর অস্তিত্বই নেই — শুধু অংশগুলো একটা নির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজানো আছে, তার বেশি কিছু নয়। যদি তাই হয়, তাহলে যে "যৌগিক বস্তু"-কে কারণ খুঁজতে হবে বলে যুক্তিটা দাবি করছে, সেই বস্তুই হয়তো সেই অর্থে আসলে নেই।
দ্বিতীয় আপত্তিটা আরও গভীর এবং আগ্রহোদ্দীপক। ধরা যাক যুক্তিটা পুরোপুরি সফল — তাহলেও এটা কি আমাদের একটা "মন" পর্যন্ত পৌঁছে দেয়? একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বর, যিনি জানেন, ভাবেন, ভালোবাসেন? শ্মিড বলছেন, "মন" থাকা মানেই কিছুটা অভ্যন্তরীণ পার্থক্য থাকা — একজন চিন্তাকারী, আর তার চিন্তা, এই দুটো সম্পূর্ণ অভিন্ন হলে "চিন্তা করা" ধারণাটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু নব্য-প্লেটোনিক যুক্তি যে সত্তার কথা বলছে, সেখানে কোনো অভ্যন্তরীণ পার্থক্যই নেই — সবকিছু সম্পূর্ণ অখণ্ড। তাহলে কি এই "সম্পূর্ণ সরল" সত্তা আদৌ চিন্তা করতে, জানতে, ইচ্ছা করতে পারে? এটা এমন একটা টান যা স্বয়ং ধর্মতাত্ত্বিকরাও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিয়ে আলোচনা করেছেন।
দুই পক্ষের অবস্থান
যে ঐতিহ্য প্লোটিনাস থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান, ইহুদি আর মুসলিম দার্শনিকদের হাত ধরে বিকশিত হয়েছে সেই ক্লাসিক্যাল দর্শনের সমর্থকরা (যেমন: ফেজার) মনে করেন এই আপত্তিগুলোর যুক্তিসংগত উত্তর আছে। অন্যদিকে শ্মিডের মতো সমালোচকরা মনে করেন, যুক্তিটা খুব বেশি হলে একটা নৈর্ব্যক্তিক "অস্তিত্বের ভিত্তি" প্রমাণ করে — কোনো একজন ব্যক্তিগত, চিন্তাশীল ঈশ্বর নয়। কেউ কেউ আবার এই "ভিত্তি"-কেই ঈশ্বর বলে মেনে নিতে রাজি, কেউ রাজি নন।
যা লক্ষণীয়, তা হলো এই যুক্তির প্রশ্নটা আসলে আমাদের অস্তিত্বের একেবারে মূলে গিয়ে ঠেকে। আমরা সচরাচর ভাবি, "একটা জিনিস কেন তৈরি হলো" তার উত্তর খুঁজি অতীতে — কে বানালো, কবে বানালো। কিন্তু এই যুক্তি জিজ্ঞেস করছে অন্য এক প্রশ্ন: এই মুহূর্তে, ঠিক এখন, কেন এই জিনিসটা "একটা জিনিস" হয়ে টিকে আছে, ভেঙে পড়ছে না? এটা এমন একটা প্রশ্ন যা আমরা সচরাচর করিই না, অথচ একবার করলে সহজে মাথা থেকে যায় না।
দার্শনিক যুক্তিগুলো যেন বড় একটা পাজলের অনেকগুলো পিস এবং এই যুক্তিটিও একটি পিস। আইসোলেটেড ভাবে, এই পিসগুলো আসলে স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে একেকটা ভিত্তি দেয় এবং সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন সেই ভিত্তির ওপর কাঠামো দাড় করিয়ে দেয়। সব মিলিয়ে এ স্থাপনা দৃঢ় স্রষ্টায় দৃঢ় বিশ্বাসের যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে।


